একজন ক্রিকেটারের ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারের সিদ্ধান্ত যে বৈশ্বিক ক্রীড়া অর্থনীতিতে কতটা ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে, তার জ্বলন্ত উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বর্তমান পরিস্থিতি। মোস্তাফিজুর রহমানকে ঘিরে আইপিএলের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত এখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বাণিজ্যিক ভিত্তিকে নাড়িয়ে দিচ্ছে।
বিতর্কের মূলে কী?
আইপিএলের গত নিলামে কলকাতা নাইট রাইডার্স (KKR) ৯ কোটি ২০ লাখ রুপিতে মোস্তাফিজুর রহমানকে দলে নিলেও পরে রহস্যজনকভাবে তাকে ছেড়ে দেয়। এই ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক চাপ থাকার অভিযোগ ওঠে, যা বাংলাদেশ ক্রিকেট মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। এর রেশ ধরে বাংলাদেশ আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বর্জনের সিদ্ধান্ত নেয়। পরিস্থিতি আরও জটিল হয় যখন পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) ঘোষণা করে যে, তারা পুরো টুর্নামেন্ট না ছাড়লেও ভারতের বিপক্ষে হাই-ভোল্টেজ ম্যাচটি খেলবে না।
৬ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্যিক ধাক্কা
ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, একটি ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ কেবল একটি খেলা নয়, এটি একটি বৈশ্বিক বাণিজ্যিক উৎসব। এই ম্যাচ বর্জনের ঘোষণায় আইসিসি যে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে তার খতিয়ান নিচে দেওয়া হলো:
বিশাল বাজারমূল্য: সম্প্রচার স্বত্ব, টিকিট বিক্রয়, বৈশ্বিক স্পনসরশিপ এবং ডিজিটাল বিজ্ঞাপন মিলিয়ে একটি ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
বিজ্ঞাপনের দর: এই দ্বৈরথের সময় মাত্র ১০ সেকেন্ডের বিজ্ঞাপনের স্লট ২৫ থেকে ৪০ লাখ রুপিতে বিক্রি হয়। একটি ম্যাচ থেকেই বিজ্ঞাপন বাবদ কয়েকশ কোটি রুপি আয় হয়।
সম্প্রচারকদের মাথায় হাত: আইসিসির সম্প্রচার স্বত্ব কেনা প্রতিষ্ঠানগুলো (যেমন জিওস্টার) তাদের বিনিয়োগের একটি বড় অংশ তোলে এই বিশেষ ম্যাচটি থেকে। ম্যাচ না হলে তারা আইসিসির কাছে বিশাল অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারে।
কূটনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকট
আধুনিক ক্রিকেট এখন আর কেবল মাঠের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন করপোরেট বিনিয়োগ এবং ভূ-রাজনৈতিক কূটনীতির অংশ।
ব্র্যান্ড ভ্যালু হ্রাস: বড় স্পনসররা টুর্নামেন্টে অর্থ বিনিয়োগ করে নির্দিষ্ট দর্শক সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে। পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মতো বড় দলগুলোর অনুপস্থিতি বা নির্দিষ্ট ম্যাচ বর্জন ব্র্যান্ডগুলোর প্রচারণায় বড় বাধা সৃষ্টি করবে।
আইসিসির ওপর চাপ: ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ না হওয়া মানে আইসিসির বার্ষিক রাজস্ব আয়ের একটি বড় অংশ ধসে পড়া। এর ফলে সহযোগী দেশগুলোর উন্নয়ন ফান্ডের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
আর্থিক লোকসানের কবলে বাংলাদেশও
বিশ্বকাপ বর্জন করলে কেবল আইসিসি নয়, বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে বাংলাদেশও। অংশগ্রহণ ফি, আইসিসির লভ্যাংশ এবং দেশীয় স্পনসরদের সাথে চুক্তিবদ্ধ অর্থ মিলিয়ে কয়েক কোটি ডলারের লোকসান গুনতে হতে পারে বিসিবি-কে।
সব মিলিয়ে, মাঠের বাইরের এক সিদ্ধান্ত এখন বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসি-কে ইতিহাসের অন্যতম বড় আর্থিক ও প্রশাসনিক সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।