ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান–কে অভিনন্দন জানিয়েছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা। অভিনন্দন বার্তায় তারা বাংলাদেশের জনগণকেও শুভেচ্ছা জানিয়েছেন এবং নবনির্বাচিত সরকারের সঙ্গে অর্থনীতি, নিরাপত্তা, জলবায়ু, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে একসঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিনন্দন
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্ক রুবিও গতকাল শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে বিএনপি ও তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান। তিনি লেখেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ও এর নেতা এবং বাংলাদেশের জনগণকে অভিনন্দন। তিনি আরও বলেন, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তা জোরদারে নবনির্বাচিত সরকারের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী যুক্তরাষ্ট্র।
এর আগে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসন নির্বাচনে ঐতিহাসিক বিজয়ের জন্য বিএনপি ও তারেক রহমানকে শুভেচ্ছা জানান। এক বার্তায় তিনি বলেন, একটি সফল নির্বাচন আয়োজনের জন্য বাংলাদেশের জনগণকে অভিনন্দন এবং দুই দেশের অভিন্ন লক্ষ্য বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্র একসঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী।
যুক্তরাজ্যের বার্তা
ঢাকায় ব্রিটিশ হাইকমিশন এক বিবৃতিতে বিএনপি ও তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানায়। বার্তায় বলা হয়, বাংলাদেশ একটি নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অভিবাসন, জলবায়ু পরিবর্তন ও নিরাপত্তা—এই চারটি অগ্রাধিকার ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্য বাংলাদেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে চায়।
চীনের প্রতিক্রিয়া
ঢাকায় চীনের দূতাবাস দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের বরাত দিয়ে জানায়, নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। চীন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে সম্মান জানায় এবং দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা আরও গভীর করার প্রত্যাশা রাখে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, উচ্চমানের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’সহ অবকাঠামো, বাণিজ্য ও বিনিয়োগে সহযোগিতা জোরদার করতে চীন প্রস্তুত। একই সঙ্গে চীন–বাংলাদেশ সামগ্রিক কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারত্বকে আরও শক্তিশালী করার ইচ্ছার কথা জানানো হয়।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ফোন
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান। তিনি লেখেন, ভারত একটি গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখবে।
পরে দুপুরে মোদি ফোনে তারেক রহমানের সঙ্গে কথা বলেন। এক্সে দেওয়া বার্তায় তিনি উল্লেখ করেন, নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য বিজয়ের জন্য তিনি অভিনন্দন জানিয়েছেন এবং বাংলাদেশের জনগণের প্রত্যাশা পূরণে তার প্রচেষ্টার জন্য শুভকামনা জানিয়েছেন।
পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর অভিনন্দন
পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি ও প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ পৃথক বার্তায় তারেক রহমান ও বিএনপিকে অভিনন্দন জানান।
জারদারি বলেন, পাকিস্তান বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে সমর্থন করে এবং বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিনিময় জোরদার করতে আগ্রহী। তিনি আশা প্রকাশ করেন, নতুন রাজনৈতিক পরিবেশ দক্ষিণ এশিয়ায় আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাভিত্তিক সম্পৃক্ততা গড়ে তুলবে।
শাহবাজ শরিফ এক্সে লিখেছেন, নির্বাচনে বড় ধরনের বিজয় অর্জনের জন্য তিনি তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানাচ্ছেন এবং বাংলাদেশের জনগণকেও শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন। পরে রাতে ফোনালাপে দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্ক স্মরণ করে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদারের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
মালয়েশিয়ার আগ্রহ: সম্পর্কের নতুন গতি
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম তাঁর এক্স বার্তায় বলেন, এটি গণতন্ত্রের এক বিজয়। চ্যালেঞ্জিং সময় অতিক্রম করে বাংলাদেশের জনগণ ব্যালটের মাধ্যমে তাদের মত প্রকাশ করেছেন।
তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস–এর ভূমিকাও প্রশংসা করেন। আনোয়ার বলেন, মালয়েশিয়া বাংলাদেশের নতুন নেতৃত্বের সঙ্গে কাজ করে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নতুন গতি দিতে চায়।
দক্ষিণ এশিয়ার অন্য নেতাদের শুভেচ্ছা
মালদ্বীপ
মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মোহামেদ মুইজ্জু লিখেছেন, দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা আরও গভীর করতে তিনি একসঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী।
নেপাল
নেপালের প্রধানমন্ত্রী সুশীলা কারকি বলেন, সফল নির্বাচন আয়োজনের জন্য বাংলাদেশ সরকার ও জনগণকে অভিনন্দন। প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক জোরদারে তিনি ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে চান।
ভুটান
ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে বলেন, এই বিপুল জনসমর্থন তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রতি জনগণের আস্থার প্রতিফলন। তিনি দুই দেশের উষ্ণ বন্ধুত্ব আরও জোরদারের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
শ্রীলঙ্কা
শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েকে বলেন, এই বিজয় তারেক রহমানের প্রতি জনগণের আস্থার প্রতীক। ভবিষ্যতে দুই দেশের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার আগ্রহের কথাও জানান তিনি।
কূটনৈতিক তাৎপর্য
বিশ্লেষকদের মতে, একসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত ও পাকিস্তানের অভিনন্দন বার্তা পাওয়া বাংলাদেশের নতুন সরকারের জন্য একটি তাৎপর্যপূর্ণ কূটনৈতিক মুহূর্ত। ইন্দো-প্যাসিফিক ভূরাজনীতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় বড় শক্তিগুলোর আগ্রহ স্বাভাবিক।
নতুন সরকারের সামনে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, বিনিয়োগ আকর্ষণ, আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষা ও বৈদেশিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জ থাকবে। তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দ্রুত অভিনন্দন ও কাজ করার আগ্রহ ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক তৎপরতার জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফলের পর এখন দৃষ্টি নতুন সরকার গঠন ও নীতিগত অগ্রাধিকার নির্ধারণের দিকে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সক্রিয় ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি কতটা সফলভাবে পরিচালিত হয়—সেই প্রশ্নের উত্তর মিলবে আগামী দিনগুলোতে।