
অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতিতে অন্যতম চালিকা শক্তি হিসেবে পরিচিত প্রায় ৫৪ বিলিয়ন ডলারের আন্তর্জাতিক শিক্ষা খাত বর্তমানে এক গভীর অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশটিতে অভিবাসন নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক, জনমনে অভিবাসনবিরোধী মনোভাবের উত্থান এবং শিক্ষার্থী ভিসা প্রক্রিয়ায় কঠোর নিয়ন্ত্রণ—সব মিলিয়ে এই বিশাল বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে দক্ষিণ এশিয়ার শিক্ষার্থীদের ওপর, বিশেষ করে বাংলাদেশ, নেপাল ও ভারতের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে।
শিক্ষার্থী ভিসা অনুমোদনের হার কমে যাওয়া, প্রক্রিয়ায় ধীরগতি এবং অতিরিক্ত যাচাই–বাছাইয়ের কারণে অনেক শিক্ষার্থী এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। ফলে অস্ট্রেলিয়াকে উচ্চশিক্ষার গন্তব্য হিসেবে বেছে নেওয়ার বিষয়ে অনেকেই নতুন করে ভাবছেন।
অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনে শিক্ষা খাতের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশটির বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ ও নীতিনির্ধারকরা। সেখানে প্রপার্টি কাউন্সিলের নির্বাহী পরিচালক ডক্টর অ্যাডেল লাউসবার্গ বর্তমান পরিস্থিতিকে আন্তর্জাতিক শিক্ষাবাজারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, ২০১৯ সালের ভয়াবহ দাবানলের সময় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে অস্ট্রেলিয়াকে নিয়ে যেভাবে নেতিবাচক চিত্র তুলে ধরা হয়েছিল, তা দেশটির পর্যটন খাতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলেছিল। তাঁর মতে, বর্তমানে অভিবাসনবিরোধী রাজনৈতিক বক্তব্য ও সংবাদ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের মাঝেও একই ধরনের ভীতি তৈরি করছে।
ডক্টর লাউসবার্গ বলেন, বিদেশে বসে যখন সম্ভাব্য শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন অস্ট্রেলিয়ার সংবাদমাধ্যমে অভিবাসন নিয়ে নেতিবাচক বার্তা দেখেন, তখন তারা এই দেশকে উচ্চশিক্ষার গন্তব্য হিসেবে বেছে নিতে নিরুৎসাহিত হন। এতে দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক শিক্ষা খাতের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল আন্তর্জাতিক শিক্ষাবিষয়ক সহকারী মন্ত্রী জুলিয়ান হিল একই সম্মেলনে স্বীকার করেন যে সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার কিছু অঞ্চল থেকে শিক্ষার্থী ভিসার আবেদনে অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটেছে। তাঁর দাবি, এসব আবেদনের একটি অংশ প্রকৃত শিক্ষার্থী নয় বা ‘অসাধু’ উদ্দেশ্যে করা হয়েছে।
তিনি জানান, ২০২২ সালের মে মাসে নেপাল থেকে শিক্ষার্থী ভিসার আবেদনকারীর সংখ্যা চীনকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল, যা অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন কর্তৃপক্ষের কাছে অস্বাভাবিক বলে মনে হয়েছে। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার ভিসা যাচাই প্রক্রিয়ায় কঠোরতা বাড়িয়েছে এবং আবেদন প্রক্রিয়ায় ধীরগতি নীতি অনুসরণ করছে।
এর ফল হিসেবে ইতিমধ্যে নতুন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে বলে তিনি জানান।
হিল আরও সতর্ক করে বলেন, কিছু বিশ্ববিদ্যালয় কেবল আর্থিক ঘাটতি পূরণ করতে বিদেশে নতুন ক্যাম্পাস খুলে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তির পরিকল্পনা করছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এসব উদ্যোগ সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম।
অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত সিডনিভিত্তিক অভিবাসন আইনজীবী মোহাম্মদ নিজামউদ্দিন মনে করেন, সাম্প্রতিক নীতিগত পরিবর্তন দক্ষিণ এশীয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করছে।
তিনি বলেন,
“অস্ট্রেলিয়ার শিক্ষাব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ এশীয় শিক্ষার্থীদের কাছে আস্থার জায়গা ছিল। কিন্তু ভিসা প্রক্রিয়ায় জটিলতা ও নীতিমালার ঘন ঘন পরিবর্তন মেধাবী শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। সরকারকে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী এবং দেশীয় রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।”
ভিসা জটিলতা ও কঠোর নীতির প্রভাব পড়ছে ইতিমধ্যে অস্ট্রেলিয়ায় অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের ওপরও। সিডনির একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ফাহিম হোসেন (ছদ্মনাম) বলেন, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের নিয়ে নেতিবাচক আলোচনা তাঁদের মানসিকভাবে চাপে ফেলছে।
তিনি বলেন,
“আমরা এখানে লাখ লাখ টাকা খরচ করে পড়তে আসি। কিন্তু এখন এমন একটা পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরাই সব সমস্যার মূল। এই ধরনের প্রচার আমাদের জন্য হতাশাজনক।”
অন্যদিকে আরেক শিক্ষার্থী সুলতানা আকতার (ছদ্মনাম) মনে করেন, নিয়মকানুন অবশ্যই থাকা উচিত, তবে তা যেন স্বচ্ছ ও যুক্তিসঙ্গত হয়।
তার ভাষায়,
“অস্ট্রেলিয়া যদি তার শিক্ষার মান ও আন্তর্জাতিক সুনাম ধরে রাখতে চায়, তাহলে মেধাবী শিক্ষার্থীদের নিরুৎসাহিত করা উচিত নয়। নীতিমালা থাকবে, কিন্তু সেটি যেন পরিষ্কার ও ন্যায্য হয়।”
শিক্ষাবিদদের মতে, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী শুধু বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং অস্ট্রেলিয়ার সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও বড় অবদান রাখে। টিউশন ফি, আবাসন, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং বিভিন্ন সেবাখাতে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ব্যয়ের মাধ্যমে প্রতি বছর বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে ওঠে।
তাই বিশেষজ্ঞদের মতে, অস্ট্রেলিয়া যদি আন্তর্জাতিক শিক্ষা খাতে বিশ্বে তার শক্ত অবস্থান ধরে রাখতে চায়, তবে সরকারকে একদিকে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিতে হবে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য ইতিবাচক ও স্থিতিশীল নীতিগত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
অন্যথায়, দীর্ঘমেয়াদে এই বহু বিলিয়ন ডলারের শিক্ষা খাত সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে—যার প্রভাব পড়বে অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতি ও বৈশ্বিক শিক্ষা বাজারে দেশটির অবস্থানের ওপর।