
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ পর্যালোচনায় গঠিত জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি কাজ শুরু করেছে। প্রথম দিনের বৈঠকেই ৪০টি অধ্যাদেশ নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং ‘জুলাই গণ–অভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশ-২০২৬’–এর বিষয়ে কমিটি নীতিগতভাবে একমত হয়েছে। এটি সংসদে অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করা হবে বলে জানিয়েছেন কমিটির সভাপতি।
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ ভবনের ক্যাবিনেট কক্ষে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদিন। বৈঠক শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “অর্ধেকের কম অধ্যাদেশ পরীক্ষা–নিরীক্ষা করা হয়েছে। কিছু বিষয়ে সদস্যদের ভিন্নমত রয়েছে। সেগুলো পরবর্তী বৈঠকে আলোচনা হবে, প্রয়োজনে লিখিত মতামত নেওয়া হবে।”
তিনি জানান, আগামীকাল বুধবার বেলা দুইটায় আবার বৈঠক শুরু হবে। ২ এপ্রিলের মধ্যে সংসদে প্রতিবেদন দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
বিশেষ কমিটির আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্ব পায় ‘জুলাই গণ–অভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশ-২০২৬’। বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, “জুলাই ইনডেমনিটির বিষয়ে সবাই পুরোপুরি একমত হয়েছে। প্রয়োজনে সংশোধনী পরে বিবেচনা করা যেতে পারে।”
বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী–এর সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম খানও জানান, জুলাই যোদ্ধাদের সুরক্ষার বিষয়ে অধ্যাদেশে যে বিধান রাখা হয়েছে, তাতে তাঁরা একমত।
বৈঠক শেষে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা সংবিধান ও জন–আকাঙ্ক্ষা—দুটিকে সমন্বয় করে এগোতে চাই। সংবিধান অবশ্যই সবার ঊর্ধ্বে।”
অন্যদিকে রফিকুল ইসলাম খান বলেন, “সংবিধান মানুষের জন্য, সংবিধানের জন্য মানুষ নয়। জুলাই চেতনাকে সমুন্নত রাখতে প্রয়োজনে সংবিধানে পরিবর্তন হতে পারে।”
এই মন্তব্যগুলো সংসদে ভবিষ্যৎ বিতর্কের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
প্রথম দিনের বৈঠকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ–সংশ্লিষ্ট ১টি, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়–সংশ্লিষ্ট ৫টি, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ৪টি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ৭টি, ভূমি মন্ত্রণালয়ের ১টি, প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ১টি, পরিবেশ ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়ের ৩টি, নারী ও শিশুবিষয়ক ১টি, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন ২টি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ ২টি, সংস্কৃতি ২টি, যুব ও ক্রীড়া ৪টি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ২টি এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়–সংশ্লিষ্ট ৫টি অধ্যাদেশ নিয়ে আলোচনা হয়।
এর মধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন), সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন), গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার, পুলিশ কমিশন, সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণ, বৈদেশিক অনুদান নিয়ন্ত্রণ, ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, বন ও বন্য প্রাণী সংরক্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন), বেসামরিক বিমান চলাচল (সংশোধন), জুলাই গণ–অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর অধ্যাদেশসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
কমিটির সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম জানান, সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৩–৩৫ বছর করার প্রস্তাব এলেও আলোচনার পর ৩২ বছর নির্ধারণে কমিটি একমত হয়েছে। ‘জুলাই গণ–অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর অধ্যাদেশ-২০২৫’ হুবহু রাখার বিষয়েও নীতিগত ঐকমত্য হয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে উপস্থাপিত অধ্যাদেশগুলো দ্রুত পর্যালোচনা করে আইনে রূপ দেওয়ার প্রক্রিয়া রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ‘জুলাই ইনডেমনিটি’ অধ্যাদেশের অনুমোদন ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে।
কমিটির সদস্যরা জানিয়েছেন, এক বৈঠকে ১৩৩টি অধ্যাদেশের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়। একাধিক বৈঠকে ধাপে ধাপে যাচাই–বাছাই করে সুপারিশ চূড়ান্ত করা হবে।
সব মিলিয়ে, বিশেষ কমিটির এই পর্যালোচনা প্রক্রিয়া শুধু আইনগত নয়, রাজনৈতিকভাবেও তাৎপর্যপূর্ণ। সংবিধান, গণ–আকাঙ্ক্ষা ও প্রশাসনিক সংস্কারের প্রশ্নে যে বিতর্ক সামনে আসছে, তা আগামী দিনগুলোতে জাতীয় সংসদের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।