
মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে নিজের ভূমিকা সম্পর্কে বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। তিনি বলেন, “আমি বিদ্রোহ না করলে তখন কিন্তু বিদ্রোহ হতো না। উনি (জিয়াউর রহমান) ছিলেনই না। উনি অনুপস্থিত ছিলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের দিকে যাচ্ছিলেন। ওনাকে যদি ফিরিয়ে না আনতাম, কয়েক মিনিট পর ওনাকে মেরে কর্ণফুলীতে ফেলে দিত।”
বুধবার বিকেলে ঢাকার জাতীয় প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে আয়োজিত এ আলোচনা সভার আয়োজন করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামির ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখা। অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন অলি আহমদ।
মুক্তিযুদ্ধে সাবসেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব পালনকারী অলি আহমদ বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ‘বীর বিক্রম’ খেতাবপ্রাপ্ত। সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রেক্ষাপটে তাঁর এ বক্তব্য নতুন করে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে চট্টগ্রামে এক নির্বাচনী জনসভায় জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেছিলেন, একাত্তরে চট্টগ্রাম থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা এসেছিল এবং “উই রিভল্ট” বলে প্রথম চিৎকার করেছিলেন কর্নেল অলি আহমদ; তিনি জিয়াউর রহমানকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যান।
এই বক্তব্য নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বুধবার অলি আহমদ বলেন, “জামায়াত আমির বলেছিলেন ‘উই রিভল্ট’ কর্নেল অলি বলেছিল—এটা নিয়ে অনেকের গায়ে জ্বলন ধরেছে। জিয়াউর রহমান নিজেই এসিআরে (অ্যানুয়াল কনফিডেনশিয়াল রিপোর্ট) এ বিষয়ে বলে গিয়েছিলেন।”
সমালোচকদের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, “ডকুমেন্টগুলো আর্কাইভে আছে। যদি ইংরেজি না জানো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির অধ্যাপক নিয়ে গিয়ে পড়াও। আর যদি সেখানে অসুবিধা হয়, আমার বাসায় আসো—অরিজিনাল এসিআর আমি রেখে দিয়েছি। চাকরি ছাড়ার সময় সঙ্গে নিয়ে এসেছি।”
বক্তব্যে অলি আহমদ দাবি করেন, মুক্তিযুদ্ধের ৫০ বছর পেরোলেও জিয়াউর রহমানের শাসনামল ছাড়া অন্য কোনো সময় প্রশাসনে দলীয়করণ বন্ধ ছিল না।
তিনি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে উদ্দেশ করে বলেন, “আপনার বাবা (জিয়াউর রহমান) স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে বিশ্বে পরিচিত হয়েছিলেন, আপনার মা (খালেদা জিয়া) সংসদীয় গণতন্ত্র প্রবর্তনের জন্য প্রসিদ্ধ হয়েছিলেন। আপনিও সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে ইতিহাসে নাম লেখান।”
প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, “চাটুকারের অভাব নেই। দোষ করবে মন্ত্রী, কিন্তু বোঝা বইতে হবে আপনাকেই। আপনি কেন সেই বোঝা তুলবেন?”
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব ও উদ্বোধনী বক্তব্য দেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য আবদুস সবুর ফকির। সঞ্চালনা করেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সেক্রেটারি শফিকুল ইসলাম মাসুদ।
সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। বিশেষ অতিথি ছিলেন দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
এ ছাড়া বক্তব্য দেন মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান (মিলন), মোবারক হোসাইন, কর্মপরিষদ সদস্য জসীমউদ্দিন সরকার, হেলাল উদ্দিন, কেন্দ্রীয় মজলিশে শূরা সদস্য কামাল হোসেন, অবসরপ্রাপ্ত সাবেক সেনা কর্মকর্তা হাসিনুর রহমান এবং ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহীদুল ইসলাম প্রমুখ।
একাত্তরের ২৬ মার্চের ঘোষণাপর্ব নিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। ঐতিহাসিক দলিল, প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান এবং রাজনৈতিক অবস্থানের ভিন্নতায় বিষয়টি বারবার আলোচনায় এসেছে। অলি আহমদের সাম্প্রতিক বক্তব্য সেই বিতর্ককে আবারও সামনে নিয়ে এলো।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনালগ্নের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে যেকোনো বক্তব্য ঐতিহাসিক সংবেদনশীলতার সঙ্গে যুক্ত। ফলে এ ধরনের মন্তব্য স্বাভাবিকভাবেই জনমনে ও রাজনৈতিক পরিসরে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়।