
জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে কোনো আপস নয়—এমন অবস্থান স্পষ্ট করে বিএনপি সরকারের সমালোচনা করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামির আমির শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, “আপনি সংবিধানের এক অংশ মানবেন, আরেক অংশ মানবেন না—এটা হয় না। আপনি গোশত মানেন, কিন্তু ঝোল খাইতে রাজি না। একই তরকারি, একই বাসনে পাকানো হয়েছে। গোশতটা খেয়ে নিলেন, বলছেন ঝোলটা হারাম।”
বুধবার বিকেলে ঢাকার জাতীয় প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে জামায়াতের ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখা এই সভার আয়োজন করে।
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে বিএনপির অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলে জামায়াত আমির বলেন, “একটা অর্ডারের ভিত্তিতে দুইটা ভোট একই দিনে হয়েছে। এখন একবার বলছেন অক্ষরে অক্ষরে মানব, আবার বলছেন জনগণ না বুঝে রায় দিয়েছে। জনগণ বুঝুক বা না বুঝুক, ভোটের অধিকার তার—আপনার না।”
তিনি আরও বলেন, জনগণকে অবমূল্যায়ন করলে তার রাজনৈতিক মূল্য দিতে হবে। “যেই দেশবাসী রক্ত দিয়ে ফ্যাসিবাদ হটানোর রাস্তা চিনে ফেলেছে, সেই দেশবাসীকে আর দমানো যাবে না।”
পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় শাসক বদলালেও শোষণের ধারা বদলায়নি—এমন মন্তব্য করে শফিকুর রহমান বলেন, “আমরা চেয়েছিলাম গণতন্ত্রের ট্রেন রেললাইনে উঠুক। কিন্তু এখানে প্রশাসক, ওখানে প্রশাসক—এটা তো সংবিধানবিরোধী।”
তিনি দাবি করেন, সংবিধান অনুযায়ী স্থানীয় সরকারে নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই দায়িত্ব পালনের কথা। অথচ দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন স্থানে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। “এদের কে নির্বাচন করল? জাতির ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আমরা এগুলো মানি না,” বলেন তিনি।
বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট টেনে জামায়াত আমির বলেন, পাকিস্তান আমলে ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ স্লোগানের মাধ্যমে বৈষম্যহীন সমাজের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তা বাস্তবায়িত হয়নি। “জনরায়কে অগ্রাহ্য করে বুলেট ও বেয়নেট দিয়ে মানুষের আকাঙ্ক্ষা দমিয়ে রাখতে চেয়েছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। নির্বিচারে হত্যা, নির্যাতন ও ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মানুষ জয়ী হয়েছে,” বলেন তিনি।
স্বাধীনতার পরও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন না আসার জন্য নেতৃত্বের ব্যর্থতা, লোভ ও দুর্নীতিকে দায়ী করেন শফিকুর রহমান। তাঁর ভাষায়, “বোতল পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু ভেতরের জিনিস পরিবর্তন হয়নি।”
দুর্নীতি শুধু অর্থ আত্মসাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বলে মন্তব্য করেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, “সবচেয়ে বড় দুর্নীতি হলো মানুষের অধিকার হরণ করা, অযোগ্য লোককে যোগ্য জায়গায় বসানো এবং যোগ্য মানুষকে অপমান করে সরিয়ে দেওয়া। যতদিন এই বিষবাষ্প দূর না হবে, ততদিন স্বাধীনতার সুফল মিলবে না।”
আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব ও উদ্বোধনী বক্তব্য দেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য আবদুস সবুর ফকির। সঞ্চালনা করেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সেক্রেটারি শফিকুল ইসলাম মাসুদ।
সভায় প্রধান বক্তা ছিলেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
এ ছাড়া বক্তব্য দেন রফিকুল ইসলাম খান, সাইফুল আলম খান, মোবারক হোসাইন, জসীমউদ্দিন সরকার, হেলাল উদ্দিন, কামাল হোসেন, হাসিনুর রহমান ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহীদুল ইসলামসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা।
এর আগে বিকেল তিনটার দিকে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়। পরে মহানগর শিল্পীগোষ্ঠী ‘এই দেশ আমার বাংলাদেশ’ শীর্ষক দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন করে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গণভোট ও সংবিধান প্রশ্নে জামায়াতের এ অবস্থান বর্তমান রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। জাতীয় স্বার্থ, গণতন্ত্র ও নির্বাচনী ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান আরও স্পষ্ট হওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।