
মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলায় একটি টেক্সটাইল মিল জ্বালিয়ে দেওয়ার হুমকি ও প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপককে গলা কাটার ভয় দেখানোর অভিযোগ উঠেছে জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের এক নেতার বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় দেওয়া মুঠোফোনের কথোপকথনের একটি অডিও রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে, যা নিয়ে জেলায় তীব্র আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, হুমকি দেওয়া ব্যক্তি মো. শহিদুল ইসলাম (শহিদ), যিনি মুন্সিগঞ্জ জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সিনিয়র সহসভাপতি। হুমকির শিকার আবদুর রহমান, মুন্সিগঞ্জ সদরের পঞ্চসার ইউনিয়নের চরমুক্তারপুর এলাকায় অবস্থিত আইডিয়াল টেক্সটাইল মিলের ব্যবস্থাপক।
প্রায় পাঁচ মিনিটের ওই অডিও রেকর্ডে শোনা যায়, ফোনের শুরুতে ব্যবস্থাপক আবদুর রহমান সালাম দিলে শহিদুল ইসলাম জবাব দেন। এরপর তিনি জানতে চান, কেন তাঁর ফোনকল ধরা হয়নি এবং কেন নম্বর ব্লক করা হয়েছে। একপর্যায়ে কথোপকথন উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
রেকর্ডে শহিদুল ইসলামকে আবদুর রহমানের মা–বাবাকে নিয়ে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করতে শোনা যায়। আবদুর রহমান ফোন না ধরার কারণ ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করলেও শহিদুল কথা না শুনে বেপরোয়া আচরণ করেন। তিনি টেক্সটাইল মিল জ্বালিয়ে দেওয়ার হুমকি দেন এবং পাঁচ মিনিটের মধ্যে ফ্যাক্টরি ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন। একপর্যায়ে তাঁকে গলা কাটার হুমকিও দেওয়া হয়।
দুই দিন ধরে অডিওটি ফেসবুকে ঘুরছে। অনেকে এটি শেয়ার করে মন্তব্যের ঘরে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। ‘গজারিয়ার রাজনীতি’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে মুন্সিগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. কামরুজ্জামান (রতন)-এর সঙ্গে শহিদুল ইসলামের একটি ছবি শেয়ার করে লেখা হয়—“রতন ভাই, অরে আপনার লগে আর রাইখেন না।”
আইডিয়াল টেক্সটাইল মিলের ব্যবস্থাপক আবদুর রহমান বলেন, “শহিদুল আমাকে কী ভাষায় গালিগালাজ করেছে, আপনারা শুনেছেন। আল্লাহ তার বিচার করবেন।”
ঘটনার কারণ জানতে চাইলে তিনি সরাসরি কিছু বলতে না চাইলেও দাবি করেন, ঈদুল ফিতরের আগে তাঁর প্রতিষ্ঠানের কাছে এক লাখ টাকা চাঁদা চাওয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, “পঞ্চসার ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আবদুর জব্বার আমাদের প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। শহিদুল জব্বারের মাধ্যমে এক লাখ টাকা চেয়েছিলেন। আমরা দিইনি। এতে তিনি ক্ষিপ্ত হন।”
আবদুর জব্বার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ঈদের বন্ধের আগে তাঁকে দিয়ে এক লাখ টাকা চাওয়া হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটি টাকা দেয়নি বলেও জানান তিনি।
অডিও রেকর্ডটি নিজের বলে স্বীকার করেছেন শহিদুল ইসলাম। তবে তাঁর দাবি, এটি প্রায় এক বছর আগের ঘটনা। তিনি বলেন, “ওই প্রতিষ্ঠানে দুর্ঘটনায় একজন কর্মী মারা যান। ওই বিষয়ে কথা বলতে চেয়েছিলাম। ফোন না ধরায় রাগ করে এমন কথা বলেছিলাম।”
চাঁদা দাবির অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন।
চরমুক্তারপুর এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে শহিদুল ইসলাম মুক্তারপুর ও চরমুক্তারপুর এলাকায় প্রভাব বিস্তার করেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ধানের শীষ প্রতীকের পক্ষে সক্রিয় ছিলেন। নির্বাচনের পর তাঁর প্রভাব আরও বাড়ে বলে দাবি করেন স্থানীয়রা।
তাঁদের অভিযোগ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়মিত চাঁদা দাবি করা হয়। কখনো তিনি নিজে, কখনো তাঁর অনুসারীরা এ কাজ করেন। এছাড়া তাঁর ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে এলাকায় মাদক ব্যবসার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও রয়েছে।
ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শিল্পপ্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ধরনের হুমকি শিল্পাঞ্চলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
তবে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত থানায় কোনো মামলা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা না নেওয়া হলে এ ধরনের ঘটনা ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে। শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন প্রশাসনের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।