
দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুই পাবলিক পরীক্ষা—এসএসসি ও এইচএসসি—প্রতি বছর ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সম্ভাব্যতা যাচাইসহ একগুচ্ছ সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে এ পরিকল্পনা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বুধবার ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে আয়োজনের লক্ষ্যে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় বিষয়টি গুরুত্ব পায়। সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে—২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় দেশের সব শিক্ষা বোর্ডে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়া হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় বিষয়সংখ্যা কমানোর প্রয়োজনীয়তা ও সম্ভাব্যতা যাচাই করতে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হবে।
বর্তমানে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষাবর্ষ জানুয়ারি থেকে শুরু হয়ে ডিসেম্বরেই শেষ হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এসএসসি পরীক্ষা ফেব্রুয়ারির শুরুতে এবং এইচএসসি পরীক্ষা এপ্রিলের শুরুতে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছিল। করোনাকাল পরবর্তী পরিস্থিতিতে পরীক্ষার সূচি আরও পিছিয়ে যায়।
উদাহরণ হিসেবে, ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষা শুরু হচ্ছে ২১ এপ্রিল এবং এইচএসসি পরীক্ষা জুন মাসে। এতে শিক্ষাবর্ষ ও পরীক্ষার সময়সূচির মধ্যে অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, ডিসেম্বর বাংলাদেশের ঐতিহ্যগত ‘পরীক্ষার মৌসুম’। বিদ্যালয়ের বার্ষিক পরীক্ষাও এ সময়েই হয়। ফলে সময় সমন্বয় করা গেলে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষাও ডিসেম্বরে নেওয়া সম্ভব।
তবে শিক্ষাবিদদের প্রধান শর্ত—দুই বছরের পাঠচক্র যেন কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
নির্ধারিত সময় নিশ্চিত করতে হবে। পাঠ্যসূচি অসম্পূর্ণ রেখে পরীক্ষার সময় এগিয়ে আনা হলে শিখনঘাটতি তৈরি হতে পারে—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড–এর এক সাবেক চেয়ারম্যান বলেন, দুই বছরের কোর্স সুষ্ঠুভাবে সমন্বয় করা গেলে ডিসেম্বরে পরীক্ষা নেওয়ায় সমস্যা নেই; বরং এতে ইতিবাচক ফল আসতে পারে। তবে নির্ধারিত পাঠসময়ের সঙ্গে আপস করা যাবে না।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে গঠিত পরামর্শক কমিটির প্রধান ছিলেন মনজুর আহমদ। তাঁর নেতৃত্বাধীন কমিটি সেপ্টেম্বর থেকে জুন সময়সীমাকে শিক্ষাবর্ষ হিসেবে নির্ধারণ এবং জুলাই–আগস্টে গ্রীষ্মকালীন ছুটি রাখার সুপারিশ করেছিল।
নতুন পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি বলেন, “উদ্দেশ্য ভালো। পরিকল্পনা করে বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে পরীক্ষা নেওয়া গেলে তা ইতিবাচক হবে। তবে হুটহাট করে নয়, দুই থেকে তিন বছরের রূপকল্প নিয়ে বাস্তবায়ন করতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে বছরের শেষে পরীক্ষা নিয়ে দ্রুত ফল প্রকাশ করা গেলে শিক্ষার্থীরা পরবর্তী বছরের শুরুতেই উচ্চতর শ্রেণিতে ভর্তি হতে পারবে, ফলে সময়ের অপচয় কমবে।
সভায় ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় দেশের সব বোর্ডে অভিন্ন প্রশ্নপত্র প্রণয়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে মূল্যায়নে সমতা ও মাননিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার লক্ষ্য রয়েছে।
এ ছাড়া ভবিষ্যতে বিষয়সংখ্যা কমিয়ে মূল দক্ষতাভিত্তিক মূল্যায়নে জোর দেওয়ার সম্ভাবনাও যাচাই করা হবে। অধ্যাপক মনজুর আহমদের নেতৃত্বাধীন কমিটি মাধ্যমিকে বাংলা, ইংরেজি, গণিত, সমাজপাঠ ও বিজ্ঞানের মতো মৌলিক বিষয়ের ওপর পাবলিক পরীক্ষা সীমিত রাখার সুপারিশ করেছে। প্রশ্ন হবে দক্ষতা ও প্রয়োগভিত্তিক।
কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী—
এসএসসি ও এইচএসসি দেশের বৃহত্তম পাবলিক পরীক্ষা। গত বছর কেবল ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় ১৪ লাখ ৭৯ হাজার ৩১০ জন শিক্ষার্থী। পাসের হার ছিল ৬৮.০৪ শতাংশ, যেখানে আগের বছর ছিল ৮৩.৭৭ শতাংশ। জিপিএ–৫ পেয়েছিল ১ লাখ ২৫ হাজার ১৮ জন শিক্ষার্থী (পুনর্নিরীক্ষণের পর সংখ্যা কিছুটা বৃদ্ধি পায়)।
এ বিশাল সংখ্যক পরীক্ষার্থীকে সময়মতো ফল দিয়ে উচ্চশিক্ষার পরবর্তী ধাপে নেওয়া শিক্ষানীতির বড় চ্যালেঞ্জ।
শিক্ষাবর্ষ ও পরীক্ষা–সূচি পুনর্বিন্যাসের মতো বড় পরিবর্তন বাস্তবায়নে সময়, প্রস্তুতি ও নীতিগত সমন্বয় প্রয়োজন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে—
তবে শিক্ষার্থীদের শিখনঘাটতি এড়ানো এবং দুই বছরের পূর্ণ পাঠচক্র নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
এখন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের কমিটির সুপারিশ ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনার দিকেই তাকিয়ে আছে শিক্ষা সংশ্লিষ্ট মহল।