
ইরান যুদ্ধের তৃতীয় সপ্তাহে ডোনাল্ড ট্রাম্প ওভাল অফিসে বসে পড়েন এক ক্রান্তিকালীন মুহূর্তে। তাঁর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা একদল গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিয়ে হাজির হন।
জনমত ও অর্থনীতির চাপ
ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের জনমত জরিপকারী টনি ফ্যাব্রিজিও সম্প্রতি পরিচালিত জরিপে দেখা যায়, প্রেসিডেন্টের শুরু করা এই যুদ্ধ দিন দিন জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। জ্বালানি তেলের দাম প্রতি গ্যালন চার ডলার ছাড়িয়েছে, শেয়ারবাজারে ধস নেমেছে এবং লাখ লাখ আমেরিকান প্রতিবাদে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ১৩ জন মার্কিন সেনার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়ায় ট্রাম্পের একনিষ্ঠ সমর্থকরাও এই সংঘাতের সমালোচনা শুরু করেছেন।
হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ সুজি ওয়াইলস এবং তাঁর সহকর্মীরা ট্রাম্পকে সতর্ক করেছেন—যত দীর্ঘ হবে যুদ্ধ, ততই তাঁর জনসমর্থন এবং নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জয়ের সম্ভাবনা হুমকির মুখে পড়বে। প্রশাসনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ট্রাম্প এখনও প্রতিদিন সামরিক কর্মকর্তাদের তৈরি যুদ্ধক্ষেত্রের সাফল্যের ভিডিও দেখছেন এবং এটিকে নিজের বড় সাফল্য হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছেন।
তবে ওয়াইলস উদ্বিগ্ন ছিলেন যে ট্রাম্পকে মূলত ইতিবাচক চিত্র দেখানো হচ্ছে, যা বাস্তবতার সঙ্গে মিলছে না। তিনি সহকর্মীদের সতর্ক করেছেন, প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আরও স্পষ্ট ও সৎভাবে আলোচনা করা প্রয়োজন।
যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ঝুঁকি
প্রেসিডেন্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রকে বিদেশি সংঘাত থেকে দূরে রাখার এবং অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা বিপরীত প্রভাব ফেলছে। জ্বালানিসংকট, শেয়ারবাজারের পতন এবং বিশ্ব অর্থনীতির ধীরগতি—সবই মার্কিন নাগরিক ও আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে।
পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালির সম্ভাব্য অচলাবস্থা বিশ্ব বাজারে তেলের সরবরাহকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করতে পারে। এ কারণে প্রেসিডেন্ট হতাশ হয়ে পড়েছেন এবং নিজের কর্মকর্তাদের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়েছেন। যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব ক্রমেই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ বৃদ্ধি করছে।
ট্রাম্পের যুদ্ধ পরিকল্পনা ও মনোভাব
হোয়াইট হাউসের সূত্র মতে, ট্রাম্প এখন এমন একটি রাস্তা খুঁজছেন যা বিজয় ঘোষণা করার সুযোগ রাখে, লড়াই বন্ধ করা যায় এবং রাজনৈতিক ক্ষতি সীমিত রাখা সম্ভব। তিনি চান এ অভিযান চূড়ান্ত সাফল্যে রূপ নিক।
১ এপ্রিল জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প বলেছেন, অভিযান ‘সমাপ্তির পথে’। তবে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র আগামী দুই-তিন সপ্তাহের মধ্যে ইরানের ওপর ‘চরম আঘাত’ হানবে। তিনি দেশটির জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংস করার হুমকিও দিয়েছেন।
পরদিন, এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে তিনি টাইমকে বলেছেন, ইরান যুদ্ধ শেষ করার জন্য তিনি চুক্তি করতে আগ্রহী। তিনি বলেন, “মানুষ বলছে, ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে আলোচনা করছেন না। আমার মতে, এটি একটি সহজ আলোচনা।”
সামরিক পরিস্থিতি ও অপারেশন এপিক ফিউরি
প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ও অন্যান্য কর্মকর্তারা তেহরানের পাল্টা হামলার তীব্রতায় বিস্মিত হয়েছেন। ইরান কুয়েত, বাহরাইন, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারেও হামলা চালিয়েছে।
পেন্টাগনের হিসাব অনুযায়ী, অপারেশন এপিক ফিউরি সামরিকভাবে সফল—ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার ৯০ শতাংশ ধ্বংস, লঞ্চারের ৭০ শতাংশ অকেজো, এবং ১৫০টির বেশি নৌযান বিকল বা ধ্বংস হয়েছে। এর পাশাপাশি ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের অনেককে হত্যা করা হয়েছে।
তবে হোয়াইট হাউসের নির্ধারিত সময়সীমায় ট্রাম্পের বৃহত্তর লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হচ্ছে না—যেমন পারমাণবিক অস্ত্রের পথ স্থায়ীভাবে বন্ধ করা বা ইসলামি প্রজাতন্ত্রের কট্টরপন্থী শাসনের পরিবর্তন।
ট্রাম্প ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
প্রেসিডেন্ট বলেছেন, তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে প্রাণঘাতী সিদ্ধান্ত নেওয়ার অনুমতি দেবেন না। চেইন অব কমান্ড সর্বদা মানুষের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। তিনি বলেন, “আমি এআইকে এটি করতে দেব না। এটি এমন একটি সিদ্ধান্ত, যা একজন প্রেসিডেন্টকেই নিতে হবে—যদি তিনি যোগ্য হন।”
যুদ্ধের শেষ পরিণতি এখনও অস্পষ্ট। ট্রাম্প একই সঙ্গে লড়াই আরও তীব্র করার এবং তা গুটিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। হোয়াইট হাউসের ভিতরে ক্রমেই উপলব্ধি বাড়ছে, পরিস্থিতি হয়তো তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক, সামরিক এবং অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ একসঙ্গে মোকাবিলা করতে হচ্ছে—যা মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রিপাবলিকানদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।