
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখনো চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকা এবং লেবানন ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হওয়ায় ঘোষিত শান্তি উদ্যোগ কতটা টেকসই হবে—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এরই মধ্যে যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে একটি উচ্চপর্যায়ের তেহরান–ওয়াশিংটন সংলাপ আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে।
রয়টার্স ও Al Jazeera সূত্রে জানা গেছে, দুই সপ্তাহ মেয়াদি যুদ্ধবিরতির মধ্যেই শুক্রবার থেকে ইসলামাবাদে প্রাথমিক আলোচনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। আনুষ্ঠানিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে পারে শনিবার। তবে এখন পর্যন্ত অংশগ্রহণকারী প্রতিনিধিদের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হয়নি।
ইসলামাবাদে ‘সংলাপ উদ্যোগ’ ও প্রস্তুতি
প্রস্তাবিত এই কূটনৈতিক উদ্যোগকে ঘিরে ইসলামাবাদে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পাকিস্তান সরকার শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে দুই দিনের ছুটি ঘোষণা করেছে এবং বিভিন্ন স্থানে চলাচলে কড়াকড়ি আরোপ করেছে।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদল আজ ইসলামাবাদে পৌঁছাতে পারে। নিরাপত্তা পরিস্থিতি মূল্যায়নের জন্য ইতিমধ্যে ৩০ সদস্যের একটি অগ্রবর্তী দল সেখানে অবস্থান করছে। অন্যদিকে ইরানও তাদের প্রতিনিধিদল পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে নিশ্চিত করেছেন দেশটির উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খাতিবজাদেহ।
যুদ্ধবিরতি ঘিরে অনিশ্চয়তা
যদিও কাগজে-কলমে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে, বাস্তব পরিস্থিতি তা পুরোপুরি প্রতিফলিত করছে না। লেবাননে ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত থাকায় শান্তি প্রক্রিয়া ভেঙে পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি পুরো আঞ্চলিক যুদ্ধবিরতি কাঠামোকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে।
ইরানের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী দেওয়া ১০ দফা প্রস্তাবের অন্তত তিনটি ইতিমধ্যে লঙ্ঘিত হয়েছে। বিশেষ করে Strait of Hormuz পুরোপুরি স্বাভাবিকভাবে চালু না হওয়ায় উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট Donald Trump হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, চুক্তি কার্যকর না হলে আরও বড় পরিসরে সামরিক অভিযান চালানো হতে পারে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা Mojtaba Khamenei বলেছেন, দেশটি যুদ্ধ চায় না, তবে জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে কোনো ছাড় দেবে না।
লেবানন কেন্দ্রিক উত্তেজনা
ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত থাকায় লেবানন পরিস্থিতি নতুন করে কূটনৈতিক সংকট তৈরি করেছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট Joseph Aoun জানিয়েছেন, ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
অন্যদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী Benjamin Netanyahuও আলোচনা শুরুর ইঙ্গিত দিলেও তার সরকারের প্রতিরক্ষামন্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে জানিয়েছেন, “যুদ্ধ থামবে না”—যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
প্রতিনিধিদল ও আলোচনার সম্ভাব্য কাঠামো
সূত্রের বরাতে জানা গেছে, ইসলামাবাদ সংলাপে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে অংশ নিতে পারেন ভাইস প্রেসিডেন্ট J.D. Vance, কূটনীতিক স্টিভ উইটকফ এবং সাবেক উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনার।
ইরানের প্রতিনিধিদলে থাকতে পারেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি, পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী মাজিদ তাখত-রাভানচি।
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ও পাল্টা বার্তা
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, আলোচনার লক্ষ্য একটি “সৎ ও বাস্তবসম্মত চুক্তি” অর্জন করা। তবে একই সঙ্গে Donald Trump সামাজিক মাধ্যমে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, চুক্তি কার্যকর না হলে মার্কিন বাহিনী আবারও সামরিক পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রীও দাবি করেছেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সংক্রান্ত বিষয়গুলো আলোচনার প্রধান শর্ত হওয়া উচিত, যার মধ্যে ইউরেনিয়াম নিয়ন্ত্রণ ও মজুত হস্তান্তরের প্রসঙ্গও রয়েছে।
বিশ্লেষকদের সতর্কতা
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংলাপ উদ্যোগ অত্যন্ত ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। ইরানের ১০ দফা শর্তের একাধিক লঙ্ঘন, ইসরায়েলের অব্যাহত সামরিক অভিযান এবং যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবস্থান—সব মিলিয়ে আলোচনার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।
জাতিসংঘে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত মালিহা লোধি মন্তব্য করেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের ভূমিকা যুদ্ধবিরতির সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে।
অন্যদিকে মার্কিন নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর প্রভাব যুদ্ধবিরতি প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলেছে।
হরমুজ প্রণালিতে চলাচল সংকট
যুদ্ধবিরতির পরও Strait of Hormuz দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হয়নি। শিপিং ডেটা অনুযায়ী, দিনে স্বাভাবিক ১৩৫টি জাহাজ চলাচলের পরিবর্তে এখন মাত্র অল্প কয়েকটি জাহাজ পার হচ্ছে।
বীমা ঝুঁকি, নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং সম্ভাব্য টোল আরোপের আশঙ্কায় বাণিজ্যিক জাহাজগুলো এখনো ব্যাপকভাবে রুট পরিবর্তন করছে বলে জানা গেছে।
সামগ্রিক চিত্র
সব মিলিয়ে ইসলামাবাদ সংলাপকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার একটি নতুন কূটনৈতিক চেষ্টা শুরু হলেও বাস্তব পরিস্থিতি এখনো সংঘাতমুখী। যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও তা কতদিন টিকবে, তা নির্ভর করছে ইসরায়েল, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী অবস্থানের ওপর।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক অগ্রগতি যেমন সম্ভব, তেমনি যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের উত্তেজনা ফিরে আসার ঝুঁকিও রয়ে গেছে।