
তথ্যসূত্র: ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস (Financial Times)
ইরান–যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি নিয়ে প্রকাশ্যে কঠোর অবস্থান দেখালেও পর্দার আড়ালে মার্কিন প্রশাসনই দ্রুত যুদ্ধ থামাতে সক্রিয়ভাবে উদ্যোগী ছিল বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ দৈনিক Financial Times। পত্রিকাটির অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump একদিকে ইরানকে কঠোর সামরিক হুমকি দিচ্ছিলেন, অন্যদিকে গোপনে যুদ্ধবিরতির জন্য আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীদের ওপর চাপ প্রয়োগ করছিলেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির প্রধান কূটনৈতিক চ্যানেল হিসেবে পাকিস্তানকে ব্যবহার করা হয়। ওয়াশিংটনের ধারণা ছিল, মুসলিম ও প্রতিবেশী দেশ হওয়ায় পাকিস্তান ইরানকে সহজে প্রভাবিত করতে পারবে।
পাকিস্তানকে কেন্দ্র করে গোপন কূটনৈতিক চাপ
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, কয়েক সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের ওপর চাপ বাড়িয়ে আসছিল, যাতে তারা ইরানকে যুদ্ধ থামাতে এবং কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দিতে রাজি করায়।
এই প্রক্রিয়ায় পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন বলে দাবি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনিই ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে মধ্যস্থতা করে শেষ পর্যন্ত দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির কাঠামো তৈরি করেন।
এই যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসে এমন এক সময়, যখন ট্রাম্প প্রকাশ্যে ইরানকে ‘সভ্যতা ধ্বংসের’ হুমকি দিয়েছিলেন। তবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হঠাৎ যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসে।
জ্বালানি সংকট ও যুদ্ধের চাপেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন
প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যাওয়া এবং ইরানের প্রতিরোধ যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করার সক্ষমতা—এই দুই বিষয়ই যুক্তরাষ্ট্রকে কৌশলগতভাবে চিন্তায় ফেলে দেয়।
একাধিক সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, গত ২১ মার্চ থেকেই ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে যুদ্ধবিরতির বিষয়ে চাপ বাড়ছিল।
ভ্যান্স–মুনির যোগাযোগ ও ইসলামাবাদ প্রক্রিয়া
প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়, যুদ্ধবিরতির চূড়ান্ত পর্যায়ে ট্রাম্পের দেওয়া সময়সীমা শেষ হওয়ার আগ মুহূর্তে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান একাধিকবার মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট JD Vance–এর সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
এরপর তিনি ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করেন এবং দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব চূড়ান্ত করেন।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী Shehbaz Sharif সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। তবে তার পোস্টে ‘খসড়া’ শব্দ থেকে যাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে কূটনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়, যা বিশ্লেষকদের মতে আগেভাগে প্রস্তুত করা বিবৃতির ইঙ্গিত দেয়।
যুক্তরাষ্ট্রের গোপন প্রস্তাব ও ইরানের পাল্টা অবস্থান
সূত্রগুলোর দাবি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামনে ১৫ দফা একটি খসড়া শান্তি প্রস্তাব দেয়। পাকিস্তানের মাধ্যমে সেই প্রস্তাব তেহরানে পৌঁছে দেওয়া হয়।
এর জবাবে ইরান ৫ ও ১০ দফার পাল্টা প্রস্তাব দেয়। শুরুতে উভয় পক্ষ অনড় অবস্থানে থাকলেও পরে সীমিত মেয়াদের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়।
এক পর্যায়ে ইরান নীতিগতভাবে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিনিময়ে যুদ্ধবিরতির বিষয়ে আগ্রহ দেখায়। তবে দেশটির ভেতরে ক্ষমতাধর সামরিক সংস্থা ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর (IRGC)-এর আপত্তি বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
আইআরজিসি দ্বন্দ্ব ও আঞ্চলিক উত্তেজনা
প্রতিবেদনে বলা হয়, IRGC–এর একটি অংশ যুদ্ধবিরতির বিরোধিতা করে এবং পারস্য উপসাগরে উত্তেজনা বাড়ানোর পক্ষে অবস্থান নেয়।
এ সময় সৌদি আরবের জুবাইল এলাকায় একটি ড্রোন হামলার ঘটনাও ঘটে, যা শান্তি আলোচনাকে ব্যাহত করার চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পাকিস্তান এই ঘটনায় কঠোর প্রতিক্রিয়া জানায় এবং তেহরানকে সতর্ক করে দেয়।
চূড়ান্ত কূটনৈতিক সমীকরণ
শেষ মুহূর্তে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ও ইরানের প্রেসিডেন্টের মধ্যে ফোনালাপের পর তেহরান আলোচনার জন্য প্রতিনিধি পাঠাতে সম্মত হয়।
বর্তমানে সম্ভাব্য আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে JD Vance, স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার এবং ইরানের পক্ষ থেকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ও পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ অংশ নিতে পারেন বলে জানা গেছে।
চীনের ভূমিকা ও আঞ্চলিক সমীকরণ
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এই সংকটে চীনও পরোক্ষভাবে ভূমিকা রাখে। পাকিস্তান ও চীনের যৌথ উদ্যোগে একটি পাঁচ দফা পরিকল্পনা যুদ্ধবিরতির চাপ তৈরি করে।
চীনের লক্ষ্য ছিল মূলত পারস্য উপসাগরের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, কারণ অঞ্চলটি তাদের জ্বালানি ও বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্লেষণ: প্রকাশ্য বক্তব্য বনাম গোপন বাস্তবতা
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর সামরিক অবস্থান দেখালেও বাস্তবে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ এড়াতে কূটনৈতিক পথই বেশি সক্রিয় ছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই যুদ্ধবিরতি ছিল একদিকে সামরিক চাপ, অন্যদিকে অর্থনৈতিক উদ্বেগ ও আঞ্চলিক মধ্যস্থতার সমন্বিত ফলাফল।