
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন (Special Intensive Revision – SIR) প্রক্রিয়ায় বাদ পড়া ভোটারদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে সংশোধন কার্যক্রম স্থগিতের আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। তবে একই সঙ্গে আদালত প্রতিকার ও আপিলের পথ খোলা রাখার বিষয়েও গুরুত্ব দিয়েছে।
সোমবার (১৩ এপ্রিল ২০২৬) ভারতের প্রধান বিচারপতি Justice Surya Kant এবং বিচারপতি Justice J. B. Pardiwala সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এ রায় দেন।
আবেদন খারিজ, তবে প্রতিকার ব্যবস্থার সুযোগ বহাল
আদালত জানিয়েছে, ভোটার তালিকা সংশোধন কার্যক্রম (SIR) স্থগিত করার মতো কোনো পরিস্থিতি বর্তমান পর্যায়ে তৈরি হয়নি। ফলে বাদ পড়া ভোটারদের করা রিট পিটিশন খারিজ করা হয়।
তবে বেঞ্চ স্পষ্টভাবে বলেছে, আবেদনকারীরা চাইলে নির্ধারিত আপিল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রতিকার চাইতে পারবেন। যদি রাজ্যস্তরের ট্রাইব্যুনাল সময়মতো শুনানি না করে, তবে আইন অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া যাবে।
আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আপিল মঞ্জুর হলে তার প্রভাব স্বাভাবিকভাবেই কার্যকর হবে।
প্রায় ৯১ লাখ ভোটারের ইস্যু
আবেদনকারীদের অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর প্রক্রিয়ায় প্রায় ৯১ লাখ ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন, যাদের অনেকেই এখনো আপিল ট্রাইব্যুনালে প্রতিকার পাওয়ার অপেক্ষায় আছেন।
আদালত জানায়, এ ধরনের সব মামলাই নির্ধারিত ট্রাইব্যুনাল পর্যায়ে দুই সপ্তাহের মধ্যে শুনানি হওয়া উচিত, যাতে ভোটাধিকার নিয়ে অনিশ্চয়তা দীর্ঘায়িত না হয়।
নির্বাচন কমিশনের অবস্থান
ভারতের নির্বাচন কমিশনের পক্ষে আদালতে সওয়াল করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী Dama Seshadri Naidu।
তিনি জানান, যেসব ভোটার ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, তাঁদের ক্ষেত্রে আলাদা নথি আপলোড করার বাধ্যবাধকতা নেই।
তবে আদালত এই ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলে এবং পূর্ববর্তী বিহার সংক্রান্ত এসআইআর নির্দেশনার সঙ্গে বর্তমান অবস্থানের পার্থক্য উল্লেখ করে কমিশনকে অবস্থান পরিষ্কার করার আহ্বান জানায়।
আদালতের গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ
বিচারপতি জে. বি. পারদিওয়ালা (পাঠ্যে বাগচী হিসেবে উল্লেখিত) একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দেন, যেখানে তিনি ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ার জটিলতা ও ঝুঁকির বিষয় তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা প্রচণ্ড চাপের মধ্যে বিপুল সংখ্যক নথি যাচাই করেন, ফলে শতভাগ নির্ভুলতা সবসময় নিশ্চিত করা কঠিন।
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, দৈনিক হাজারের বেশি নথি যাচাইয়ের ক্ষেত্রে ৭০ শতাংশ নির্ভুলতাও অনেক সময় সন্তোষজনক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, তাই একটি শক্তিশালী আপিল ব্যবস্থা অপরিহার্য।
ভোটাধিকার ও নির্বাচনী ভারসাম্য নিয়ে উদ্বেগ
আদালত আরও উল্লেখ করে, ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ার বিষয়টি যদি নির্বাচনের ফলাফলের ব্যবধানের তুলনায় বড় হয়ে যায়, তাহলে তা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
তবে একই সঙ্গে আদালত স্পষ্ট করে জানায়, ভোট দেওয়ার অধিকার সংক্রান্ত বিষয়টি সবসময় নির্বাচন বাতিলের সরাসরি ভিত্তি নয়, বিশেষ করে যদি তা সীমিত সংখ্যক ভোটারের ক্ষেত্রে ঘটে।
আবেদনকারীদের দাবি
আবেদনকারীরা আদালতে আবেদন করেছিলেন, ভোটার তালিকা চূড়ান্ত করার সময়সীমা বাড়ানো হোক, যাতে আপিল প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগে তারা ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পান।
তাঁরা দাবি করেন, ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় তাঁদের নাম ছিল এবং তাঁদের কাছে আধার, পাসপোর্টসহ বৈধ পরিচয়পত্র রয়েছে। তবুও তাঁদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
সব পক্ষের শুনানি ও পর্যবেক্ষণ শেষে সুপ্রিম কোর্ট আবেদনটি খারিজ করে দেয়। তবে আদালত স্পষ্টভাবে জানায়, আপিলের সুযোগ এবং ন্যায়বিচারের পথ উন্মুক্ত থাকবে এবং নির্ধারিত ট্রাইব্যুনালগুলোর দ্রুত কার্যক্রম গ্রহণ জরুরি।
সার্বিক মূল্যায়ন
এই রায়ের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর প্রক্রিয়া আপাতত অব্যাহত থাকছে। তবে আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, দ্রুত আপিল নিষ্পত্তি এবং প্রশাসনিক নির্ভুলতা নিশ্চিত করার ওপর ভবিষ্যতে আরও গুরুত্ব দিতে হবে বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।