
রাজনৈতিক ফ্যাসিবাদের চেয়েও ‘সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদ’ বাংলাদেশের জন্য অধিকতর বিপজ্জনক—এমন অভিমত দিয়েছেন দেশের একাধিক চিন্তক, গবেষক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। তাঁদের মতে, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন মানুষের অধিকার সীমিত করে, কিন্তু সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদ মানুষের দীর্ঘদিনের জীবনধারা, বিশ্বাস ও আত্মপরিচয়কে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
সোমবার বিকেলে রাজধানীর তোপখানা রোডে বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন-এর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত ‘বাংলাদেশের কালচার: আত্মপরিচয়ের অন্বেষণ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এসব বক্তব্য উঠে আসে। সভায় সভাপতিত্ব করেন আন্দোলনের সমন্বয়ক হাসনাত কাইয়ূম।
‘সংস্কৃতি’ অনুপস্থিত রাজনৈতিক আলোচনায়
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সাংবাদিক ও গবেষক ইমরান মাহফুজ। তিনি বলেন, স্বাধীনতার দীর্ঘ সময় পরও দেশে মুক্তচিন্তার সংকট রয়ে গেছে।
তাঁর ভাষায়, “বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের শতবর্ষ পেরিয়েও আমরা আজ মতপ্রকাশের সংকটে ভুগছি।” তিনি আরও জানান, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন দলের নেতাদের ভাষণ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ‘সংস্কৃতি’ বিষয়টি প্রায় অনুপস্থিত—যা গভীর সাংস্কৃতিক শূন্যতার ইঙ্গিত বহন করে।
ভিন্নমতকে শত্রু ভাবার সংস্কৃতি নিয়ে উদ্বেগ
সভাপতির বক্তব্যে হাসনাত কাইয়ূম বলেন, দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ভিন্নমতকে শত্রু হিসেবে দেখার প্রবণতা বেড়েছে। তাঁর মতে, এই মানসিকতা রাষ্ট্র সংস্কারের পথে বড় বাধা।
তিনি বলেন, ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমল থেকে চলে আসা বিভাজনের রাজনীতি এখন আরও তীব্র হয়ে ‘নির্মূলের রাজনীতি’-তে রূপ নিয়েছে। এই অবস্থা থেকে বের হতে না পারলে গণতান্ত্রিক সংস্কার সম্ভব নয়।
সমন্বয়বাদী চিন্তায় ফেরার আহ্বান
আলোচনায় বক্তারা প্রখ্যাত লেখক ও চিন্তক আবুল মনসুর আহমদ-এর ‘সমন্বয়বাদী’ ও ‘ভূমিজ’ দর্শনের প্রতি গুরুত্বারোপ করেন। তাঁদের মতে, বহুমাত্রিক সামাজিক বাস্তবতায় সহাবস্থান ও সহনশীলতা নিশ্চিত করতে এই দর্শন নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
হাসনাত কাইয়ূম বলেন, বর্তমান রাজনীতিতে অর্থ ও পেশিশক্তির প্রাধান্য বেড়ে যাওয়ায় প্রজ্ঞাভিত্তিক নেতৃত্ব উঠে আসতে পারছে না। তাই রাজনৈতিক সংস্কারের আগে চিন্তার ও সংস্কৃতির সংস্কার জরুরি।
ধর্মীয় প্রভাব ও সংস্কৃতির পরিবর্তন
বিশিষ্ট লেখক ও কলামিস্ট সেলিম খান বলেন, মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক মতবাদের প্রভাবে দেশের দেশজ সংস্কৃতি পরিবর্তিত হয়েছে। তাঁর মতে, ধর্ম এখন অনেক ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক আচরণে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে, যার ফলে সমাজ তার মৌলিক মানবিক মূল্যবোধ হারাচ্ছে।
আত্মপরিচয়ের সংকট ও রাষ্ট্রের ভূমিকা
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও গীতিকার শহীদুল্লাহ্ ফরায়জি বলেন, বাংলাদেশ একটি জাতিরাষ্ট্র হলেও জাতিগত আত্মপরিচয়ের সংকটে ভুগছে। তাঁর মতে, রাষ্ট্র বারবার জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় এই সংকট আরও গভীর হয়েছে।
তিনি সতর্ক করেন, ক্ষমতার কাঠামোগত পরিবর্তন ছাড়া মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়ভিত্তিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট ও সাংস্কৃতিক সংযোগ
পশ্চিমবঙ্গের চলচ্চিত্র নির্মাতা সৌমিত্র দস্তিদার বলেন, দুই বাংলাতেই সংকীর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু সাংস্কৃতিক পরিবেশকে সংকুচিত করছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে মানবিক সম্পর্ক ও ‘মজলুমের সংস্কৃতি’কে সামনে আনার ওপর জোর দেন তিনি।
সমাপনী পর্যবেক্ষণ
আলোচনায় অংশগ্রহণকারী বক্তারা মনে করেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ ছাড়া একটি টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠন সম্ভব নয়।
তাঁদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক ও দেশীয় প্রেক্ষাপটে আত্মপরিচয়, সহনশীলতা এবং বহুত্ববাদকে কেন্দ্র করে নতুন সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলাই সময়ের দাবি।