
চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে সাবেক মেয়র মোহাম্মদ মনজুর আলম–এর বাসভবনে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নেতা ও কুমিল্লা–৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ–র সৌজন্য সাক্ষাৎ। মঙ্গলবার দুপুরে নগরের কাট্টলি এলাকায় মনজুর আলমের বাসায় এই সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। তবে বৈঠক শেষে বের হওয়ার সময় ‘জুলাই যোদ্ধা’ পরিচয়ে একদল ব্যক্তির প্রশ্নবাণে পড়েন হাসনাত, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও ছড়িয়ে পড়া ভিডিওচিত্রে দেখা যায়, মনজুর আলমের বাসভবনের সামনে অবস্থান নেওয়া কয়েকজন ব্যক্তি হাসনাত আবদুল্লাহকে ঘিরে ধরে বিভিন্ন প্রশ্ন করতে থাকেন। তাঁদের একজন প্রশ্ন তোলেন—আওয়ামী লীগের ‘দোসর’ হিসেবে অভিযুক্ত একজনের বাসায় কেন তিনি গিয়েছেন, বিশেষ করে যখন তিনি সংসদে দাঁড়িয়ে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করার দাবি তুলছেন। এ সময় পরিস্থিতি শান্ত রাখতে হাসনাত আবদুল্লাহকে হাত নেড়ে উপস্থিত লোকজনকে শান্ত করার চেষ্টা করতে দেখা যায়। পরে অন্য একজন এসে বিক্ষুব্ধদের সরে যেতে বলেন।
এ ঘটনায় তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় এনসিপির চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সমন্বয়কারী সদস্য ও মিডিয়া সেলের প্রধান রিদুয়ান হৃদয় জানান, হাসনাত আবদুল্লাহ ব্যক্তিগত কাজে চট্টগ্রামে এসেছিলেন এবং সাবেক মেয়রের আমন্ত্রণে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে তাঁর বাসায় যান। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এতে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল না।
অন্যদিকে, সন্ধ্যায় যোগাযোগ করা হলে মোহাম্মদ মনজুর আলমও একই সুরে কথা বলেন। তিনি জানান, এটি ছিল কেবল সৌজন্য সাক্ষাৎ, এর বাইরে কোনো রাজনৈতিক আলোচনা হয়নি।
তবে ঘটনার পরপরই রাজনৈতিক অঙ্গনে ভিন্ন ব্যাখ্যা উঠে আসতে শুরু করে। বিশেষ করে আসন্ন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখে মনজুর আলমের সম্ভাব্য প্রার্থিতা নিয়ে যে গুঞ্জন চলছে, তার প্রেক্ষাপটে এই সাক্ষাৎকে অনেকেই তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন। আলোচনা রয়েছে—এনসিপির প্রার্থী হিসেবে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন তিনি।
রাত আটটার দিকে এনসিপির পক্ষ থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে অবশ্য ভিন্ন ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সেখানে বলা হয়, বৈঠকে দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ সাংগঠনিক কার্যক্রম নিয়ে বিস্তারিত মতবিনিময় হয়েছে। পাশাপাশি আগামী দিনে পারস্পরিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন দুই নেতা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রকাশ্যে ‘সৌজন্য সাক্ষাৎ’ বলা হলেও বিজ্ঞপ্তির ভাষ্য ইঙ্গিত দেয় সম্ভাব্য রাজনৈতিক সমন্বয়ের দিকে। ফলে এই সাক্ষাৎ কেবল ব্যক্তিগত ছিল, নাকি এর পেছনে বৃহত্তর রাজনৈতিক কৌশল রয়েছে—তা নিয়ে জল্পনা আরও জোরালো হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০১০ সালে বিএনপির সমর্থনে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জয়ী হয়ে আলোচনায় আসেন মোহাম্মদ মনজুর আলম। তিনি তখন বর্ষীয়ান নেতা এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী–কে পরাজিত করে চমক সৃষ্টি করেন। পরে বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টাও হন তিনি। তবে ২০১৫ সালের নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলে ভোট বর্জন করে সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন।
পরবর্তীতে ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং ২০২০ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাইলেও তিনি তা পাননি। দীর্ঘ সময় রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকার পর সাম্প্রতিক সময়ে আবারও তাঁর সক্রিয়তা ও সম্ভাব্য প্রার্থিতা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সব মিলিয়ে, হাসনাত আবদুল্লাহর এই সফর ও সাক্ষাৎ চট্টগ্রামের রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সামনে সিটি করপোরেশন নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে এই ধরনের যোগাযোগ ও বৈঠক যে আরও গুরুত্ব পাবে—তা বলছেন সংশ্লিষ্টরা।