
ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও অবনতি হলে বৈশ্বিক অর্থনীতি গভীর মন্দার ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল)। সংস্থাটি বলেছে, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তীব্র হবে, যার প্রভাবে বিশ্বজুড়ে প্রবৃদ্ধি কমে যেতে পারে এবং মূল্যস্ফীতি আবারও ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে।
মঙ্গলবার প্রকাশিত এক হালনাগাদ প্রতিবেদনে ওয়াশিংটনভিত্তিক এই সংস্থাটি জানায়, মধ্যপ্রাচ্য সংকট ইতোমধ্যেই বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করেছে। পরিস্থিতির বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২৬ সালের বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস আরও কমতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রবৃদ্ধি কমার শঙ্কা ও আঞ্চলিক প্রভাব
আইএমএফের অর্ধবার্ষিক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, জ্বালানি সরবরাহ ও দামের ওপর চাপ অব্যাহত থাকলে উন্নত ও উন্নয়নশীল—দুই ধরনের অর্থনীতিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিশেষ করে জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়বে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জি–৭ ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাজ্য সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হতে পারে। সংস্থাটি যুক্তরাজ্যের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ০.৮ শতাংশে নামিয়েছে এবং একই সঙ্গে সতর্ক করেছে যে দেশটিতে মূল্যস্ফীতি ৪ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, যা সরকারি লক্ষ্যমাত্রার দ্বিগুণ।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসও সামান্য কমিয়ে ২.৩ শতাংশ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
বিশ্বমন্দার সম্ভাব্য ঝুঁকি
আইএমএফ বলছে, যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে এবং জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে না এলে বৈশ্বিক অর্থনীতি বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে। সংস্থাটির মতে, ব্যারেলপ্রতি তেলের দাম যদি ১১০ ডলারের ওপরে দীর্ঘ সময় ধরে থাকে, তবে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ২ শতাংশের নিচে নেমে যেতে পারে—যা কার্যত বিশ্বমন্দার সমান।
সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, ১৯৮০ সালের পর এমন ধরনের অর্থনৈতিক ধাক্কা বিশ্ব মাত্র কয়েকবার দেখেছে—যার মধ্যে রয়েছে ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকট এবং ২০২০ সালের কোভিড–১৯ মহামারি।
ব্রিটিশ সরকারের প্রতিক্রিয়া ও রাজনৈতিক উত্তাপ
আইএমএফের সতর্কবার্তার পর যুক্তরাজ্যের চ্যান্সেলর র্যাচেল রিভস কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি বলেন, বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি যুক্তরাজ্যের পছন্দ নয়, তবে এর অর্থনৈতিক প্রভাব দেশটিকে বহন করতে হচ্ছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, সংঘাত থেকে বের হওয়ার সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ছাড়াই বড় শক্তিগুলোর জড়ানো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা
আইএমএফের প্রধান অর্থনীতিবিদ পিয়ের-অলিভিয়ের গৌরিনচাস বলেন, প্রতিদিন পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে এবং বিশ্ব অর্থনীতি নেতিবাচক দিকেই অগ্রসর হচ্ছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তিনি আরও সতর্ক করেন, মূল্য নিয়ন্ত্রণে ভর্তুকি বা কৃত্রিম মূল্য নির্ধারণের মতো পদক্ষেপ স্বল্পমেয়াদে কার্যকর মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে তা অর্থনীতির জন্য ব্যয়বহুল হতে পারে। বরং লক্ষ্যভিত্তিক ও অস্থায়ী নীতিগত সহায়তা নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
সামগ্রিক চিত্র
বিশ্ব অর্থনীতিবিদদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা শুধু আঞ্চলিক সংকট নয়, বরং এটি বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা, জ্বালানি বাজার এবং মুদ্রাস্ফীতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। আইএমএফের সতর্কবার্তা সেই বাস্তবতাকেই নতুন করে সামনে এনেছে।
সব মিলিয়ে, সংঘাতের বিস্তার রোধ না হলে বিশ্ব অর্থনীতি নতুন এক বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে—এমন বার্তাই দিচ্ছে আইএমএফের সাম্প্রতিক মূল্যায়ন।