
দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষক নিয়োগ ও সনদ যাচাই নিয়ে আবারও বড় ধরনের অনিয়মের চিত্র সামনে এসেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ) সারা দেশে ৪৭১ জন শিক্ষককে জাল বা ভুয়া সনদের ভিত্তিতে নিয়োগপ্রাপ্ত হিসেবে শনাক্ত করেছে। এসব শিক্ষকের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ইতোমধ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরকে (মাউশি) নির্দেশনা দিয়েছে মন্ত্রণালয়।
ডিআইএর সাম্প্রতিক পরিদর্শন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, জাল সনদের এই তালিকায় থাকা শিক্ষকরা দেশের বিভিন্ন বেসরকারি স্কুল ও কলেজে কর্মরত। যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে দেখা গেছে, তাঁদের মধ্যে ১৯৪ জনের শিক্ষক নিবন্ধন সনদই জাল। এছাড়া ২২৯ জনের কম্পিউটার প্রশিক্ষণ সনদ এবং ৪৮ জনের বিপিএড, বিএড, গ্রন্থাগার বা অন্যান্য শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ ভুয়া হিসেবে শনাক্ত হয়েছে।
নির্দিষ্ট ঘটনায় যা জানা গেছে
শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার খলাভাংগা মকবুল হোসেন উচ্চবিদ্যালয়ের এক সহকারী শিক্ষকের সনদ জাল হিসেবে শনাক্ত হওয়ার ঘটনা এই অনিয়মের একটি উদাহরণ। ডিআইএ জানায়, সংশ্লিষ্ট সনদটি যাচাইয়ের জন্য সনদ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে পাঠানো হলে তারা লিখিতভাবে নিশ্চিত করে যে সনদটি ভুয়া।
এ ঘটনায় সরকারের কাছ থেকে বেতন-ভাতা হিসেবে উত্তোলিত ৩৮ লাখ টাকার বেশি অর্থ ওই শিক্ষকের কাছ থেকে আদায়যোগ্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক মো. আলী আকবর এ অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের সনদ সঠিক। তিনি বলেন, অডিট আপত্তির প্রেক্ষিতে তারা বিষয়টি ব্রডশিটে উল্লেখ করেছেন এবং এখনো চূড়ান্ত নিষ্পত্তির চিঠি পাননি।
যাচাই প্রক্রিয়া নিয়ে ডিআইএর ব্যাখ্যা
ডিআইএর এক কর্মকর্তা জানান, অধিদপ্তর নিজে কোনো সনদকে সরাসরি জাল ঘোষণা করে না। সন্দেহজনক সনদ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়ে যাচাই করা হয়। সনদ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান যেভাবে মতামত দেয়, সেটিই চূড়ান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।
তিনি আরও বলেন, একই প্রতিষ্ঠানের অন্য একটি সনদের ক্ষেত্রে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় সেটিকে সঠিক বলে নিশ্চিত করায় সেটিকে বৈধ হিসেবেই রাখা হয়েছে—যা প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা তুলে ধরে।
মন্ত্রণালয়ের পদক্ষেপ
ডিআইএর সুপারিশের ভিত্তিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্প্রতি একটি চিঠির মাধ্যমে মাউশিকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (স্কুল ও কলেজ) জনবলকাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০২৫ অনুযায়ী এসব শিক্ষকের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে মন্ত্রণালয়কে অবহিত করতেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কীভাবে উঠে এলো এই তথ্য
ডিআইএর কর্মকর্তারা জানান, নিয়মিত পরিদর্শনের সময় শিক্ষকদের সনদের কপি সংগ্রহ করা হয়। সন্দেহজনক মনে হলে তা সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় বা প্রতিষ্ঠান দিয়ে যাচাই করা হয়। ২০২৪ ও ২০২৫ সালের পরিদর্শন কার্যক্রমের ভিত্তিতেই মূলত এই ৪৭১ জনের তালিকা তৈরি হয়েছে।
এর আগে ২০২৩ সালেও একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগে ৬৭৮ জন শিক্ষকের বেতন বন্ধ করা হয়েছিল বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা
ডিআইএর পরিচালক এম এম সহিদুল ইসলাম বলেন, তারা কেবল সুপারিশ করে থাকেন, চূড়ান্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয় মন্ত্রণালয়। ইতোমধ্যে মাউশিকে চিঠি দেওয়া হয়েছে এবং দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে তারা আশা করছেন।
শিক্ষা খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত রাখা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, জাল সনদে শিক্ষক নিয়োগ শুধু আর্থিক অনিয়ম নয়, এটি শিক্ষার মানকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই কঠোর নজরদারি ও দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।