
মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালি ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে। প্রণালিটি খুলে দেওয়া হয়েছে বলে ঘোষণা দিলেও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কঠোর নৌ-অবরোধ অব্যাহত রাখার ঘোষণা এসেছে, যা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে নতুন অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে।
এই পরিস্থিতির তথ্য জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা।
হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার ঘোষণা
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতির প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করা হয়েছে।
তার ভাষায়, আন্তর্জাতিক সমন্বিত রুট অনুযায়ী ইরানের বন্দর ও সামুদ্রিক সংস্থার নির্ধারিত পথে নৌযান চলাচল করবে। এই সিদ্ধান্তকে তিনি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবস্থান
তবে এই ঘোষণার কিছুক্ষণের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভিন্ন অবস্থান জানান।
তিনি তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেন, হরমুজ প্রণালি বাণিজ্যিকভাবে উন্মুক্ত থাকলেও ইরানের ওপর মার্কিন নৌ-অবরোধ পূর্ণ শক্তিতে বহাল থাকবে, যতক্ষণ না দুই দেশের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ চুক্তি সম্পন্ন হয়।
এই অবস্থান কার্যত ইরানের সঙ্গে সামুদ্রিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ অব্যাহত রাখার ইঙ্গিত দেয়।
তেলবাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব
হরমুজ সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা কমার খবর আসার পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে তেলের দাম কিছুটা কমেছে। প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের দাম নেমে এসেছে প্রায় ৮৮ ডলারে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হওয়ায় যেকোনো অস্থিরতা সরাসরি বিশ্ববাজারে প্রভাব ফেলে।
যুদ্ধ ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন
গত কয়েক মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের পর মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা তীব্র হয়। যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে ইরানও কৌশলগতভাবে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ব্যবহার করে চাপ সৃষ্টি করে।
পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতির আলোচনা শুরু হয়। তবে পারমাণবিক কর্মসূচি ও হরমুজ নিয়ন্ত্রণ ইস্যুতে মতবিরোধের কারণে পূর্ণাঙ্গ চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
ইসলামাবাদে ব্যর্থ আলোচনা
গত শনিবার পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ-এ দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে প্রায় ২১ ঘণ্টা দীর্ঘ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনায় পারমাণবিক ইস্যু এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ প্রধান বাধা হিসেবে সামনে আসে।
শেষ পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা ছাড়াই আলোচনা ব্যর্থ হয়।
যুদ্ধবিরতির পটভূমি
চলমান সংঘাতের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র গত ৮ মার্চ ইরানের সঙ্গে দুই সপ্তাহের সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে। এই বিরতির মেয়াদ আগামী ২১ মার্চ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
এর আগে ইরান ও ইসরায়েল উভয় পক্ষেই ব্যাপক সামরিক হামলা ও ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটে, যা আঞ্চলিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
বিশ্লেষণ: কৌশলগত জলপথের প্রভাব
বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালি বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি পরিবহনের প্রধান রুট। তাই এখানে যেকোনো ধরনের সামরিক বা রাজনৈতিক উত্তেজনা সরাসরি বৈশ্বিক অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে একদিকে প্রণালি খুলে দেওয়ার ঘোষণা, অন্যদিকে নৌ-অবরোধ—দুটি বিপরীত অবস্থান আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের ভিন্ন অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। সাময়িকভাবে বাজারে কিছুটা স্বস্তি দেখা গেলেও নৌ-অবরোধ অব্যাহত থাকায় পরিস্থিতি কতটা স্থিতিশীল থাকবে, তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, স্থায়ী সমাধান ছাড়া এই উত্তেজনা শুধু আঞ্চলিক নয়, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার জন্যও বড় ঝুঁকি হয়ে থাকতে পারে।