
বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাব এসে পড়েছে দেশের জ্বালানি বাজারে। সর্বশেষ ঘোষণায় জ্বালানি তেলের দাম ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। শনিবার রাতে সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করে নতুন দর নির্ধারণ করেছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, এখন প্রতি লিটার ডিজেল ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৩০ টাকা, অকটেন ১৪০ টাকা এবং পেট্রল ১৩৫ টাকায় বিক্রি হবে। রোববার থেকে এই মূল্য কার্যকর হয়েছে।
দাম বৃদ্ধির খবরে বিভিন্ন এলাকায় ফিলিং স্টেশনে ভিড় বেড়েছে। সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) বিপণন কোম্পানিগুলোকে বাড়তি তেল সরবরাহের নির্দেশ দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চাহিদা সামাল দিতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনার জেরে বৈশ্বিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে যায়। একসময় প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার ছাড়ালেও পরে কিছুটা কমে ৯০ ডলারের আশপাশে নেমে আসে। তবে সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে এখনও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
সরকার ২০২৪ সালের মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি চালু করেছে। প্রতি মাসে আমদানি খরচের ভিত্তিতে দাম সমন্বয় করা হয়। যদিও এপ্রিলের শুরুতে দাম অপরিবর্তিত ছিল, মাসের মাঝামাঝি এসে তা বাড়ানো হলো।
এর আগে ২০২২ সালের আগস্টে এক দফায় বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি হয়েছিল। এবার ডিজেলের দাম ১৫ শতাংশ বাড়িয়ে ১১৫ টাকা করা হয়েছে, যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। অকটেন ১২০ থেকে ১৪০, পেট্রল ১১৬ থেকে ১৩৫ এবং কেরোসিন ১১২ থেকে ১৩০ টাকায় উন্নীত হয়েছে।
জেট ফুয়েল ও ফার্নেস তেলের দাম নির্ধারণ করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। আর ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দর ঠিক করে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ।
দেশে জ্বালানি আমদানি ও বিতরণের দায়িত্বে থাকা বিপিসি জানিয়েছে, স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি চাহিদা তৈরি হয়েছে। গত বছর যে পরিমাণ তেল সরবরাহ করা হয়েছিল, তা ধরে এবারও সরবরাহ দেওয়া হচ্ছিল। তবে বাড়তি চাপের কারণে নতুন করে বরাদ্দপত্র তৈরি করে সরবরাহ বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ কাজে জেলা প্রশাসনের সহায়তা নেওয়া হবে।
দেশে ব্যবহৃত জ্বালানির ৬৩ শতাংশই ডিজেল। সাম্প্রতিক জাহাজ বিলম্ব ও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে মজুত কিছুটা কমেছে। এপ্রিল মাসে ডিজেলের চাহিদা প্রায় চার লাখ টন। বর্তমানে মজুত আছে এক লাখ টনের কিছু বেশি। আরও কয়েকটি জাহাজ থেকে শিগগির নতুন সরবরাহ যুক্ত হবে বলে জানানো হয়েছে।
প্রতিদিন গড়ে ১১ হাজার টনের বেশি ডিজেল বিক্রি হচ্ছে। আজ থেকে দৈনিক সরবরাহ প্রায় ১০ শতাংশ বাড়ানোর কথা রয়েছে।
অকটেনের মজুত সক্ষমতা প্রায় ৪৬ হাজার টন। বর্তমানে মজুত আছে প্রায় ২৯ হাজার টন, যা প্রায় ২৫ দিনের চাহিদা মেটাতে সক্ষম। নতুন চালান যুক্ত হলে মজুত আরও বাড়বে। দেশীয় উৎপাদন থেকেও প্রতিদিন অকটেন যোগ হচ্ছে।
মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ৬ শতাংশ অকটেন এবং ৭ শতাংশ পেট্রল। মোটরসাইকেল, ব্যক্তিগত গাড়ি ও ছোট যানবাহনে এগুলোর ব্যবহার বেশি হওয়ায় ফিলিং স্টেশনে চাপ তৈরি হয়েছে। এপ্রিল মাসে অকটেন ও পেট্রলের সরবরাহও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু সরবরাহ বাড়ালেই পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে না। মানুষের মধ্যে আতঙ্ক কমাতে কার্যকর ব্যবস্থাপনা দরকার। ঢাকায় সরবরাহ কেন্দ্র বাড়ানো, ডিজিটাল নজরদারি ও চাহিদা মূল্যায়নের মতো পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।