
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিমূলক তথ্য প্রচারের অভিযোগে এক যুবককে গ্রেপ্তারকে কেন্দ্র করে জাতীয় সংসদে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। রোববারের অধিবেশনে বিষয়টি উত্থাপন করে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এনসিপির সংসদ সদস্য মো. আবুল হাসনাত (হাসনাত আবদুল্লাহ)। জবাবে বক্তব্য দেন চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম।
সংসদে বিতর্কের সূচনা
সন্ধ্যায় অনির্ধারিত আলোচনায় পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে হাসনাত আবদুল্লাহ অভিযোগ করেন, একটি কার্টুন শেয়ার করার কারণে একজন যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে—যা গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য উদ্বেগজনক। তিনি বলেন, “কার্টুন শেয়ার করার কারণে কাউকে গ্রেপ্তার করা হবে—এটা আমরা কল্পনাও করতে পারি না।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, সংসদে প্রশ্নোত্তর কার্যক্রম টেবিলে উত্থাপন করায় সংসদ সদস্যরা মন্ত্রীদের কাছে সম্পূরক প্রশ্ন করার সুযোগ হারাচ্ছেন। এতে সংসদ সদস্যদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার সাংবিধানিক ভূমিকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
গ্রেপ্তার ইস্যুতে সমালোচনা
হাসনাত আবদুল্লাহ বক্তব্যে ফেসবুকে চিফ হুইপকে নিয়ে একটি কার্টুন শেয়ারের জেরে এ এম হাসান নাসিম নামে এক যুবকের গ্রেপ্তারের বিষয়টি তুলে ধরেন। তাঁর দাবি, সাইবার সুরক্ষা আইনের ২৫ ধারায় করা এই মামলা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিপন্থী।
তিনি বলেন, “যেখানে কোনো যৌন নির্যাতনের বিষয় নেই, সেখানে একটি মিম বা কার্টুন শেয়ারের কারণে মামলা দেওয়া হয়েছে। এটি বিরোধী মত দমনের প্রবণতা নির্দেশ করে।” তিনি আরও অভিযোগ করেন, এ ধরনের মামলায় গ্রেপ্তারের পর সহজে জামিনও পাওয়া যাচ্ছে না।
স্পিকারের হস্তক্ষেপ
বক্তব্য দীর্ঘায়িত হলে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল হাসনাতকে বক্তব্য শেষ করার অনুরোধ জানান এবং বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপনের জন্য নোটিশ দেওয়ার পরামর্শ দেন।
চিফ হুইপের জবাব
পরে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম বক্তব্যে বলেন, সংসদ সদস্যদের প্রশ্ন করার অধিকার রয়েছে—তবে অধিবেশনের সময়সীমা ও আলোচনার চাপ বিবেচনায় অনেক সময় প্রশ্নোত্তর টেবিলে উপস্থাপন করতে হয়। তিনি বলেন, চাইলে অধিবেশনের সময় বাড়িয়ে সরাসরি প্রশ্নোত্তর চালানো সম্ভব।
কার্টুন সংক্রান্ত গ্রেপ্তারের বিষয়ে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “আমাকে নিয়ে কার্টুন আঁকার কারণে যদি কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়ে থাকে, তাহলে তাঁকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য আমি অনুরোধ জানাচ্ছি।”
তবে তিনি উল্লেখ করেন, গত ডিসেম্বর থেকে একটি নির্দিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা ও বিভ্রান্তিমূলক তথ্য প্রচারের অভিযোগে একাধিক সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটে যদি গ্রেপ্তার হয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।
সাইবার অপরাধ ও ফেক আইডি প্রসঙ্গ
চিফ হুইপ আরও বলেন, ফেসবুকসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ফেক আইডি ব্যবহার করে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে জনশক্তি রপ্তানি, মানিলন্ডারিংসহ বিভিন্ন অভিযোগের তথ্য পাওয়া গেছে—যদিও সেগুলোর সত্যতা যাচাই প্রয়োজন।
তিনি বলেন, “যদি অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। আর যদি না হয়, তাহলে ব্যক্তিগতভাবে আমার কোনো অভিযোগ নেই।”
বৃহত্তর প্রেক্ষাপট
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই বিতর্ক শুধু একটি গ্রেপ্তার ইস্যু নয়; বরং এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সাইবার আইন প্রয়োগ এবং সংসদীয় জবাবদিহি—এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে আছে। নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় সংসদে এ ধরনের বিতর্ক ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।