
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান–যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা প্রশমনের প্রচেষ্টায় এক অপ্রত্যাশিত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উঠে এসেছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। সাম্প্রতিক আলোচনায় তিনি এমন এক ভূমিকায় আবির্ভূত হয়েছেন, যা ঐতিহ্যগত কূটনৈতিক কাঠামোর বাইরের হলেও সংকট নিরসনে কেন্দ্রীয় প্রভাব ফেলছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
দ্য গার্ডিয়ান–এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বুধবার তেহরান সফরে গিয়ে তিনি ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করেন এবং যুদ্ধবিরতি ও নতুন আলোচনার কাঠামো নিয়ে বার্তা আদান–প্রদান করেন।
তেহরানে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক
তেহরান বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর আসিম মুনিরকে স্বাগত জানান ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রধান আলোচক আব্বাস আরাগচি। সামরিক পোশাকে উপস্থিত পাকিস্তানি সেনাপ্রধানকে সেখানে এক ধরনের ‘শান্তি দূত’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে টানা ২১ ঘণ্টার আলোচনা কোনো চুক্তি ছাড়াই ভেঙে যাওয়ার পর পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সেই প্রেক্ষাপটে ইসলামাবাদ সক্রিয়ভাবে মধ্যস্থতার উদ্যোগ নেয় এবং আসিম মুনিরকে সামনে রেখে নতুন কূটনৈতিক প্রচেষ্টা শুরু হয়।
যুক্তরাষ্ট্র–ইরান উত্তেজনা ও পাকিস্তানের উদ্যোগ
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইসলামাবাদ ত্যাগ করার কয়েক দিনের মধ্যেই ইরান–যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা স্থবির হয়ে পড়ে। এর পরপরই যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় দফা আলোচনার ইঙ্গিত দিলেও ইরানের ওপর অব্যাহত সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
এ অবস্থায় পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ওয়াশিংটনের একটি নতুন প্রস্তাব নিয়ে তেহরান পৌঁছান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রস্তাবটির লক্ষ্য ছিল আগামী সপ্তাহে ইসলামাবাদে নতুন আলোচনার একটি কাঠামো তৈরি করা।
“মূল চালিকা শক্তি” হিসেবে মুনির
পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত মালিহা লোদি বলেন, এই পুরো প্রক্রিয়ার মূল চালিকাশক্তি আসিম মুনির। তাঁর ভাষায়, “ফিল্ড মার্শাল মুনিরই এখানে মূল চালিকা শক্তি। তিনি না থাকলে এই প্রক্রিয়া সফল হতো না।”
তিনি আরও বলেন, পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখানে সহায়ক ভূমিকা পালন করলেও মূল আস্থা তৈরি হয়েছে সেনাপ্রধানের প্রতি। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষই এখন মুনিরের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগে আগ্রহী।
ব্যক্তিকেন্দ্রিক কূটনীতির উত্থান
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানে সামরিক নেতৃত্ব দীর্ঘদিন ধরেই পররাষ্ট্রনীতিতে প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করে আসছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আসিম মুনির সেই প্রভাবকে বৈশ্বিক পর্যায়ে নিয়ে গেছেন।
SOAS University of London–এর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ অবিনাশ পালিওয়াল বলেন, ব্যক্তিকেন্দ্রিক কূটনীতির কারণেই পাকিস্তান এখন একটি কার্যকর মধ্যস্থতাকারী হিসেবে অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প–এর প্রশাসনের সময় পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক পুনর্গঠনে মুনির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। লবিং, কৌশলগত যোগাযোগ এবং ব্যক্তিগত সম্পর্ক—সব মিলিয়ে তিনি ওয়াশিংটনের আস্থা অর্জন করেন বলে দাবি করা হয়।
এছাড়া বিভিন্ন কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় তিনি ক্রিপ্টোকারেন্সি, খনিজ সম্পদ ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সংক্রান্ত আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আঞ্চলিক প্রভাব ও কৌশলগত বাস্তবতা
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দুই প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনে পাকিস্তানের ভূমিকা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। হরমুজ প্রণালি ও মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি নিরাপত্তা সংকট এই আলোচনাকে আরও জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এই ধরনের মধ্যস্থতা দীর্ঘস্থায়ী সমাধান নাকি সাময়িক কৌশলগত পদক্ষেপ—তা এখনো স্পষ্ট নয়।
ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংকট নিরসনের প্রচেষ্টায় আসিম মুনিরের ভূমিকা পাকিস্তানকে এক নতুন ধরনের কূটনৈতিক অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে। সামরিক নেতৃত্ব থেকে বৈশ্বিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তাঁর উত্থান শুধু আঞ্চলিক রাজনীতিকেই নয়, বরং আন্তর্জাতিক ক্ষমতার ভারসাম্যকেও নতুনভাবে আলোচনায় নিয়ে এসেছে।