
যুক্তরাজ্যের উচ্চশিক্ষা খাতে নতুন ভিসানীতির প্রভাব পড়তে শুরু করেছে আগেভাগেই। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তির হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান উৎস দেশ—বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান—থেকে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
তথ্যসূত্র The Economic Times-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন ভিসা কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থা চালুর আগেই ভর্তি কমে যাওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আর্থিক ও একাডেমিক অনিশ্চয়তায় পড়েছে।
ভর্তি কমার চিত্র: ৭০% বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাব
BUILA-এর এক জরিপে দেখা গেছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৭০ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তি কমেছে। সামগ্রিকভাবে ভর্তি কমেছে ৩১ শতাংশ।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আশঙ্কা, নতুন নীতি পুরোপুরি কার্যকর হলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
জুন থেকে ‘ট্রাফিক-লাইট’ ভিসা ব্যবস্থা
আগামী জুন থেকে যুক্তরাজ্যে চালু হচ্ছে নতুন ‘ট্রাফিক-লাইট’ভিত্তিক ভিসা কমপ্লায়েন্স সিস্টেম। এ ব্যবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শিক্ষার্থীদের ভিসা অনুমোদন ও প্রত্যাখ্যানের হারের ভিত্তিতে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হবে—
সবুজ (Green): প্রত্যাখ্যান হার ৪% এর নিচে
অ্যাম্বার (Amber): ঝুঁকিপূর্ণ; নিষেধাজ্ঞার সম্ভাবনা
রেড (Red): কঠোর নিয়ন্ত্রণ বা কার্যত সীমাবদ্ধতা
জরিপ অনুযায়ী, অংশগ্রহণকারী প্রায় অর্ধেক বিশ্ববিদ্যালয় অন্তত একটি ‘নন-গ্রিন’ রেটিং পাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে নির্দিষ্ট কিছু দেশের শিক্ষার্থী ভর্তি সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে এবং যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া কঠোর করেছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় বড় ধাক্কা
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর প্রধান উৎস দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে দক্ষিণ এশিয়ায়—
৬৬% বিশ্ববিদ্যালয় জানিয়েছে, ভারত থেকে ভর্তি কমেছে
৮২% প্রতিষ্ঠান বলছে, পাকিস্তান থেকে শিক্ষার্থী কমেছে
৬৫% বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ থেকে ভর্তি কমার তথ্য দিয়েছে
কিছু প্রতিষ্ঠানে পাকিস্তানি শিক্ষার্থীর সংখ্যা আগের তুলনায় প্রায় তিন-চতুর্থাংশ পর্যন্ত কমে গেছে, যা এ অঞ্চলের জন্য বড় সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাড়তি যাচাই-বাছাই ও আর্থিক চাপ
নতুন নীতির প্রভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন আবেদনকারীদের কাছ থেকে—
অধিক আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ
বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই সাক্ষাৎকার
উচ্চ পরিমাণ অগ্রিম জামানত
চাচ্ছে। ফলে অনেক প্রকৃত শিক্ষার্থীর জন্য যুক্তরাজ্যে পড়তে যাওয়া আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
ভিসা প্রত্যাখ্যান বেড়েছে
জানুয়ারির ভর্তি মৌসুমে ৬০ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয় জানিয়েছে, ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার বেড়েছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, ভিসা কর্তৃপক্ষ আগের তুলনায় বেশি কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
নীতির সমালোচনা ও আশঙ্কা
BUILA-এর চেয়ারম্যান Andrew Bird বলেন, যুক্তরাজ্যে আগে থেকেই বিশ্বের অন্যতম কঠোর শিক্ষার্থী ভিসা কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থা চালু রয়েছে। তবে সরকারের ঘন ঘন নীতিপরিবর্তন এবং নতুন ব্যবস্থার কঠোর প্রয়োগ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, এ ধরনের কড়াকড়ি প্রকৃত ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের নিরুৎসাহিত করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এটি বৈশ্বিক উচ্চশিক্ষা বাজারে যুক্তরাজ্যের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান দুর্বল করে দিতে পারে।
বৈশ্বিক প্রভাবের শঙ্কা
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী কমে গেলে শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়, যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি, গবেষণা খাত এবং বহুসাংস্কৃতিক শিক্ষা পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর শিক্ষার্থীদের জন্য বিকল্প গন্তব্য হিসেবে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া বা ইউরোপের অন্যান্য দেশ আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।