
সরকারি বিনামূল্যের পাঠ্যবই কর্মসূচিতে বড় ধরনের অনিয়মের ইঙ্গিত মিলেছে। মাঠপর্যায়ে পাঠানো চাহিদা যাচাই করে দেখা যাচ্ছে, প্রকৃত প্রয়োজনের তুলনায় বিপুল পরিমাণ বই বেশি চাওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ২৯৩টি উপজেলার তথ্য যাচাই করে মাধ্যমিক স্তরেই ৮৮ লাখ ৪২ হাজার অতিরিক্ত বইয়ের চাহিদার প্রমাণ পেয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, সব উপজেলার তথ্য যাচাই সম্পন্ন হলে এই সংখ্যা দেড় কোটির কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।
বর্তমানে যাচাই-বাছাই শেষে সংশোধিত চাহিদা অনুযায়ী বই মুদ্রণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যাতে সরকারের অর্থ অপচয় কমানো যায়।
বছরের পর বছর অতিরিক্ত চাহিদার অভিযোগ
প্রতিবছরই বিনা মূল্যের পাঠ্যবই প্রকৃত চাহিদার তুলনায় বেশি ছাপানোর অভিযোগ ওঠে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যালয় ও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের পাঠানো অতিরিক্ত চাহিদাই এর মূল কারণ। এর ফলে প্রতি বছরই বিপুল পরিমাণ বই অব্যবহৃত থেকে যায় এবং সরকারের অর্থ গচ্চা যায়।
শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, শিক্ষার্থীর প্রকৃত সংখ্যা, ভর্তি প্রবণতা ও ঝরে পড়ার হার বিবেচনায় নিয়ে চাহিদা নির্ধারণের একটি নির্ভরযোগ্য ও তথ্যনির্ভর পদ্ধতি এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের তথ্য যাচাইয়ে আরও কঠোরতা আনা জরুরি।
কীভাবে তৈরি হয় এই অতিরিক্ত চাহিদা
এনসিটিবি সূত্রে জানা যায়, পাঠ্যবইয়ের চাহিদা নির্ধারণ করা হয় প্রায় এক বছর আগে। সে সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সম্ভাব্য শিক্ষার্থী ধরে চাহিদা পাঠায়। কিন্তু বাস্তবে এই অনুমান অনেক ক্ষেত্রে সঠিক হয় না। বরং প্রয়োজনের চেয়ে বেশি চাহিদা দেওয়া হয়।
আগে এসব তথ্য খুব বেশি যাচাই করা হতো না। ফলে অতিরিক্ত বই ছাপা হলেও সব বই কাজে লাগত না। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এনসিটিবি যাচাই প্রক্রিয়া জোরদার করেছে—গঠন করা হয়েছে একাধিক দল, যারা সরেজমিনে গিয়ে তথ্য মিলিয়ে দেখছে।
অস্বাভাবিক চাহিদা বৃদ্ধিতে সন্দেহ
চলতি বছরের জন্য মাধ্যমিক স্তরে বইয়ের চাহিদা ছিল ২১ কোটি ৩৭ লাখ ৬৭ হাজারের বেশি। কিন্তু পরবর্তী শিক্ষাবর্ষের জন্য এই চাহিদা বেড়ে দাঁড়ায় ২২ কোটি ৩২ লাখ ৩০ হাজার ৩১৮ কপিতে। এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধিতে সন্দেহ তৈরি হলে এনসিটিবি ৩৪টি দল গঠন করে মাঠপর্যায়ে যাচাই শুরু করে।
যাচাইয়ে গিয়ে বেশ কিছু এলাকায় চাহিদা ‘ফুলিয়ে–ফাঁপিয়ে’ পাঠানোর স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে। এক কর্মকর্তা জানান, ঢাকার একটি উপজেলার গুদামে গত তিন বছরের অব্যবহৃত বিপুল সংখ্যক বই মজুত রয়েছে—যা অতিরিক্ত চাহিদার বাস্তব উদাহরণ।
কোন খাতে বেশি অতিরিক্ত চাহিদা
২৩ এপ্রিল পর্যন্ত যাচাইকৃত তথ্য অনুযায়ী—
২৯৩টি উপজেলায় ৮৮ লাখ ৪২ হাজার অতিরিক্ত বই শনাক্ত
প্রথম দফায় ১১০টি উপজেলায় গড়ে সাড়ে ৮% বেশি চাহিদা
বেসরকারি স্কুল ও মাদ্রাসায় অতিরিক্ত চাহিদা তুলনামূলক বেশি
সরকারি প্রতিষ্ঠানে এ প্রবণতা তুলনামূলক কম
এনসিটিবির অবস্থান
এনসিটিবির চেয়ারম্যান মো. মাহবুবুল হক পাটওয়ারী জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে চাহিদা পাওয়ার পরই এটি অস্বাভাবিক মনে হওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই শুরু করা হয়। পরে ৩৪টি দলকে দেশের ৬৪ জেলায় পাঠানো হয়, যারা ইতোমধ্যে ১৬৮টি উপজেলা পরিদর্শন করেছে।
তিনি বলেন, “সব উপজেলার তথ্য যাচাই শেষ হলে বইয়ের সংখ্যা প্রায় দেড় কোটি পর্যন্ত কমে আসতে পারে। এতে সরকারের বড় অঙ্কের অর্থ সাশ্রয় হবে।”
সরবরাহে বিলম্ব: শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি
বই সরবরাহে বিলম্বের সমস্যাও নতুন নয়। ২০২৫ শিক্ষাবর্ষে সব বই সরবরাহ করতে সময় লেগেছিল প্রায় তিন মাস। ২০২৬ শিক্ষাবর্ষেও শতভাগ বই বিতরণ সম্পন্ন হয় ৭ ফেব্রুয়ারি—অর্থাৎ শিক্ষাবর্ষ শুরুর এক মাস সাত দিন পর। এতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
চলতি শিক্ষাবর্ষে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে মোট ৩০ কোটি ২ লাখ ৫৫ হাজার ১৫৪টি বই মুদ্রণ ও বিতরণ করা হয়েছে।
আগামী বছরের পরিকল্পনা
আগামী শিক্ষাবর্ষে সময়মতো বই সরবরাহ নিশ্চিত করতে আগেভাগেই প্রস্তুতি নিচ্ছে এনসিটিবি। সংস্থাটি জানিয়েছে, দরপত্রসহ সব কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করে আগামী ১৫ নভেম্বরের মধ্যে বই মুদ্রণ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
কর্তৃপক্ষের আশা, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের হাতে সব বই পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।
নীতিগত সংস্কারের প্রয়োজন
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু যাচাই বাড়ালেই হবে না—চাহিদা নির্ধারণের পুরো প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল ও ডেটাভিত্তিক করতে হবে। শিক্ষার্থীর প্রকৃত সংখ্যা, উপস্থিতি ও ভর্তি প্রবণতা রিয়েল-টাইম ডাটাবেজে সংরক্ষণ করা গেলে অতিরিক্ত চাহিদার সুযোগ অনেকাংশে কমে আসবে।
অন্যথায়, প্রতি বছরই ‘ফুলিয়ে–ফাঁপিয়ে’ চাহিদা দেখানোর প্রবণতা অব্যাহত থাকবে এবং সরকারের কোটি কোটি টাকা অপচয় হতে থাকবে।