
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুর তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে ধারাবাহিক সহিংসতা, জাতিগত সংঘাত ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে রয়েছে। একসময় তুলনামূলক শান্ত এই পার্বত্য রাজ্যটি এখন কার্যত বিভক্ত সমাজ ও সামরিক নিয়ন্ত্রণে থাকা এক সংঘাতপূর্ণ ভূখণ্ডে পরিণত হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে আবারও নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে বোমা বিস্ফোরণে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মাধ্যমে কয়েক মাসের তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতি ভেঙে পড়ে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
দুই জনগোষ্ঠীর দ্বন্দ্ব: সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু
মণিপুরের সংঘাতের মূল রেখাটি গড়ে উঠেছে দুই প্রধান জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে—
উপত্যকায় বসবাসকারী সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু ধর্মাবলম্বী মেইতেই জনগোষ্ঠী
পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাসকারী প্রধানত খ্রিষ্টান কুকি–জো সম্প্রদায়
মিয়ানমারের সঙ্গে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তঘেঁষা এই রাজ্যে ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানও সংঘাতকে আরও জটিল করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু একটি সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্ব নয়; বরং ভূমি, পরিচয়, অধিকার এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার বহুমাত্রিক সংঘাত।
সর্বশেষ সহিংসতা: শিশু নিহতের ঘটনায় উত্তেজনা
চলতি মাসের শুরুতে বিষ্ণুপুর জেলায় একটি বাড়িতে বোমা বিস্ফোরণে পাঁচ ও ছয় বছর বয়সী দুই শিশু নিহত হয় এবং তাদের মা আহত হন। শিশুর বাবা ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্য।
ঘটনার পর মেইতেই সংগঠনগুলো কুকি যোদ্ধাদের দায়ী করে, তবে কুকি পক্ষ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
এরপর থেকেই রাজ্যে নতুন করে সহিংসতা, অবরোধ ও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
তিন বছরের সংঘাত: কীভাবে শুরু
মণিপুরের সংঘাত নতুন নয়। তবে এর বর্তমান রূপ নেয় ২০২৩ সালে।
ঐতিহাসিকভাবে—
মেইতেইরা বসবাস করে সমতল এলাকায়, রাজধানী ইম্ফল–কেন্দ্রিক
কুকি ও নাগারা পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাস করে
ভারত স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই ভূমি ও ক্ষমতা নিয়ে এই ভারসাম্য ভঙ্গুর ছিল।
১৯৪৭ সালের পর বিশেষ ভূমি আইন অনুযায়ী—
মেইতেইরা পাহাড়ে জমি কিনতে পারে না
কুকি–জোরা তফসিল উপজাতি সুবিধা পায়
এই কাঠামোই দীর্ঘদিন ধরে অবিশ্বাস ও প্রতিযোগিতার জন্ম দেয়।
২০২৩-এর বিস্ফোরণ: হাইকোর্টের আদেশ ও দাঙ্গা
২০২৩ সালে একটি আদালতের আদেশে মেইতেইদের তফসিল উপজাতি মর্যাদা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হলে কুকি সম্প্রদায় এটিকে নিজেদের অধিকার সংকোচনের আশঙ্কা হিসেবে দেখে।
এর পরপরই রাজ্যজুড়ে ভয়াবহ দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে।
সংঘাতের সময়—
শত শত মানুষ নিহত হয়
হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়
প্রায় ৬০ হাজার মানুষ ত্রাণশিবিরে আশ্রয় নেয় (অধিকারকর্মীদের মতে সংখ্যা আরও বেশি)
রাজনৈতিক ব্যর্থতা ও কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি–র নেতৃত্বাধীন সরকারের ভূমিকা নিয়েও ব্যাপক সমালোচনা রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে—
দীর্ঘ সময় কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপ দেরিতে এসেছে
স্থানীয় সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ
মুখ্যমন্ত্রী পরিবর্তন করেও সহিংসতা থামেনি
এক পর্যায়ে রাজ্যে কেন্দ্রীয় শাসন জারি করা হয় এবং বর্তমানে সেখানে কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন রয়েছে।
সহিংসতার নতুন চক্র: চলমান বাস্তবতা
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সংঘাতের ধরন আরও জটিল হয়েছে।
রাস্তা অবরোধ ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা
আধা সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ
অতর্কিত হামলা ও হত্যা
বাফার জোন তৈরি করে গ্রাম ভাগ হয়ে যাওয়া
বর্তমানে মণিপুরে ২৫০টির বেশি কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা কোম্পানি মোতায়েন রয়েছে।
অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব
দীর্ঘ সংঘাতের ফলে মণিপুরের স্বাভাবিক জীবনব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে—
কৃষিজমির বড় অংশ বাফার জোনে
দুই সম্প্রদায়ের কৃষকেরা জমিতে যেতে পারছেন না
বাণিজ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল
তরুণদের মধ্যে অস্ত্রধারণের প্রবণতা বেড়েছে
মাদক ও সীমান্ত রাজনীতি
মণিপুর অবস্থান করছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার “গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল” অঞ্চলের পাশে, যা আন্তর্জাতিক মাদক পাচারের গুরুত্বপূর্ণ রুট হিসেবে পরিচিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ায়—
মাদক ব্যবসা ও অস্ত্র পাচার বাড়ছে
কিছু গোষ্ঠী অস্থিরতা থেকে লাভবান হচ্ছে
সংঘাত টিকিয়ে রাখার স্বার্থ তৈরি হচ্ছে
কেন থামছে না সংঘাত: বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণ
বিশ্লেষকদের মতে, মণিপুর সংকটের মূল কারণ তিনটি—
১. ভূমি ও মানচিত্রের সংঘর্ষ
প্রতিটি সম্প্রদায়ের আলাদা ভূখণ্ড দাবি একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছে।
২. রাজনৈতিক আস্থার সংকট
সরকার ও প্রশাসনের প্রতি উভয় পক্ষের গভীর অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে।
৩. দীর্ঘমেয়াদি অবহেলা
সংঘাত শুরু হওয়ার সময়ই কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।
থেমে থাকা যুদ্ধের রাজ্য
মণিপুর আজ আর শুধু একটি আঞ্চলিক সংঘাত নয়; এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটের প্রতীক।
তিন বছরের বেশি সময় ধরে চলা এই সহিংসতা দেখিয়ে দিচ্ছে—
জাতিগত বিভাজন কত দ্রুত রাষ্ট্রকে ভেঙে দিতে পারে
রাজনৈতিক ব্যর্থতা কীভাবে সংঘাত দীর্ঘায়িত করে
এবং সাধারণ মানুষের জীবন কত সহজে জিম্মি হয়ে পড়ে
যদি দ্রুত রাজনৈতিক সমাধান ও আস্থার পুনর্গঠন না হয়, তবে মণিপুরের এই “থেমে থাকা যুদ্ধ” আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।