
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ–এ বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬–এর দ্বিতীয় ও শেষ দফার ভোট গ্রহণ বুধবার শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। কলকাতাসহ মোট ৭ জেলার ১৪২টি আসনে ভোট অনুষ্ঠিত হয়। দিনের শেষে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে ভোট গ্রহণে বড় ধরনের সহিংসতা ছাড়াই কার্যক্রম শেষ হওয়ার কথা জানানো হয়।
এর আগে ২৩ এপ্রিল প্রথম দফায় ১৬ জেলার ১৫২টি আসনে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়, যা তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণ ছিল বলে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছিল। দ্বিতীয় দফায়ও বেশিরভাগ কেন্দ্রে ভোট শান্তিপূর্ণ হলেও কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ও উত্তেজনার খবর পাওয়া গেছে।
এ দফার ভোটের সবচেয়ে আলোচিত কেন্দ্র ছিল দক্ষিণ কলকাতার ভবানীপুর আসন। রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর এ আসনে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বিজেপির শীর্ষ প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী।
ভবানীপুরে উত্তেজনা, দুই শিবিরের স্লোগানবাজি
দিনের প্রথম ভাগে ভোটকেন্দ্রগুলোতে স্বাভাবিক ভোটগ্রহণ চললেও দুপুরের দিকে ভবানীপুর এলাকায় রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কেন্দ্র কালীঘাট রোডের জয় হিন্দ ভবনের সামনে তৃণমূল ও বিজেপি সমর্থকদের মধ্যে স্লোগান পাল্টা–স্লোগান হয়।
বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী এলাকা পরিদর্শনে গেলে তাঁর উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এক পক্ষ ‘জয় বাংলা’ এবং অন্য পক্ষ ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দ্রুত কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী হস্তক্ষেপ করে।
এ ঘটনায় তৃণমূল কাউন্সিলর কাজরী বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেন, বিরোধী দলের নেতা এলাকায় প্রবেশ করে অশান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করেন। অন্যদিকে শুভেন্দু অধিকারীর দাবি, সময়মতো নিরাপত্তা বাহিনী না এলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারত।
ভোটগ্রহণে শৃঙ্খলা, কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা
ভোটের দিন সার্বিকভাবে কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর নজরদারিতে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। বহু কেন্দ্রে দীর্ঘ ভোটার সারি লক্ষ্য করা গেছে এবং ভোটার উপস্থিতিও ছিল উল্লেখযোগ্য।
তবে কয়েকটি এলাকায় বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অভিযোগের খবর পাওয়া যায়। দক্ষিণ ২৪ পরগনার বাসন্তীতে রাজনৈতিক সংঘর্ষের অভিযোগ ওঠে, হুগলির চুঁচুড়ায় দলীয় কার্যালয় ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এছাড়া পূর্ব বর্ধমান ও নদীয়া জেলায় অস্ত্র উদ্ধার এবং ভোটকেন্দ্রে এজেন্টের ওপর হামলার অভিযোগও সামনে আসে।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, এসব ঘটনা পৃথকভাবে তদন্ত করা হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যান্য আসনে ভোট ও প্রার্থীদের প্রতিক্রিয়া
যাদবপুর, টালিগঞ্জ, বরাহনগরসহ বিভিন্ন আসনে শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়। যাদবপুরে ভোটার উপস্থিতি ছিল তুলনামূলকভাবে বেশি। সেখানে সিপিএম প্রার্থী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য, তৃণমূল প্রার্থী দেবব্রত মজুমদার এবং বিজেপি প্রার্থী শর্বরী মুখার্জি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
টালিগঞ্জ আসনে তৃণমূলের অরূপ বিশ্বাস, বিজেপির পাপিয়া অধিকারী এবং সিপিএমের পার্থপ্রতিম বিশ্বাস নির্বাচনী লড়াইয়ে রয়েছেন। তিনজনই নিজেদের জয় নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
বরাহনগর ও কামারহাটিসহ বিভিন্ন কেন্দ্রে সকাল থেকে ভোটারদের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে এবং কোথাও বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা হয়নি বলে স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের পর্যবেক্ষণ
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, এবারের দ্বিতীয় দফার ভোটে সামগ্রিকভাবে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় থাকলেও কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনায় তদন্ত চলছে। কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপস্থিতি ও কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে বড় ধরনের সহিংসতা এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভবানীপুরসহ কয়েকটি হাই-প্রোফাইল আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা এ নির্বাচনের গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়েছে। বিশেষ করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও শুভেন্দু অধিকারীর লড়াইকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তাপ ছিল সবচেয়ে বেশি।
এখন সকলের নজর ভোট গণনা ও ফলাফলের দিকে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, দ্রুততম সময়ের মধ্যে ফল প্রকাশের প্রস্তুতি চলছে।