
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে গত বছরের সামরিক সংঘাতের পর বৈশ্বিক অস্ত্রবাজারে চীনের যুদ্ধবিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী হয়েছে। বিশেষ করে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিরক্ষা সংস্থা AVIC Chengdu Aircraft Co. ২০২৫ সালে রেকর্ড আয় ও মুনাফা অর্জন করেছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়া।
প্রতিষ্ঠানটির প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে তাদের মোট রাজস্ব দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৫৪০ কোটি ইউয়ান (প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি মার্কিন ডলার), যা আগের বছরের তুলনায় ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি। একই সময়ে নিট মুনাফা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৪০ কোটি ইউয়ানে, যা ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করে।
রেকর্ড বিক্রি ও দ্রুত প্রবৃদ্ধি
চেংডুভিত্তিক এই প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে তাদের বিক্রি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৮০ শতাংশ বেড়েছে। এটি কোম্পানিটির ইতিহাসে অন্যতম দ্রুততম প্রবৃদ্ধি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানটি দাবি করেছে, তাদের ব্যবসায়িক সাফল্যের পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছে অভ্যন্তরীণ পুনর্গঠন এবং যুদ্ধবিমান উৎপাদন কার্যক্রমকে আরও সমন্বিত করা।
‘জে-১০’ যুদ্ধবিমান ও যুদ্ধক্ষেত্রের প্রভাব
এভিআইসি চেংডুর তৈরি একক ইঞ্জিনের বহুমুখী যুদ্ধবিমান J-10 fighter jet গত বছরের ভারত–পাকিস্তান সংঘাতের সময় আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনায় আসে।
সেই সময় পাকিস্তান দাবি করে, তারা ভারতের ফরাসি নির্মিত রাফালসহ একাধিক যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে। অন্যদিকে ভারত আংশিক ক্ষতির কথা স্বীকার করলেও নির্দিষ্ট সংখ্যা প্রকাশ করেনি এবং পাল্টা আঘাতে পাকিস্তানের বিমান ধ্বংসের দাবি করে।
এই সংঘাতের পর থেকেই চীনা যুদ্ধবিমানের কার্যকারিতা নিয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা মহলে নতুন আগ্রহ তৈরি হয়।
বৈশ্বিক বাজারে চাহিদা বৃদ্ধি
সংঘাত-পরবর্তী সময়ে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে চীনা যুদ্ধবিমানের চাহিদা বাড়তে শুরু করে। বিশেষ করে জে-১০ ও যৌথভাবে নির্মিত JF-17 Thunder fighter jet যুদ্ধবিমানের প্রতি আগ্রহ বাড়ে ইন্দোনেশিয়া, ইরাক ও বাংলাদেশসহ একাধিক দেশে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জে-১০ যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে ইন্দোনেশিয়া আগ্রহ দেখিয়েছে, আর জেএফ-১৭ নিয়ে আলোচনা চলছে কয়েকটি দেশের সঙ্গে।
কৌশলগত লক্ষ্য: রপ্তানি সম্প্রসারণ
গত সপ্তাহে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে এক প্রশ্নোত্তর পর্বে AVIC Chengdu জানিয়েছে, বৈদেশিক বাজারে অস্ত্র রপ্তানি বাড়ানো এখন তাদের কৌশলগত লক্ষ্য। পাশাপাশি তারা পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর দিকেও মনোযোগ দিচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে J-20 stealth fighter এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান প্রযুক্তি উন্নয়নে কাজ করছে।
শেনইয়াং ইউনিটের প্রবৃদ্ধিও শক্তিশালী
চীনের আরেক বড় যুদ্ধবিমান নির্মাতা AVIC Shenyang Aircraft Co. জানিয়েছে, ২০২৫ সালে তাদের বিক্রি দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৪৭০ কোটি ইউয়ান এবং মুনাফা হয়েছে ৩৫০ কোটি ইউয়ান। এটি গত বছরের তুলনায় ৩ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি।
প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, উৎপাদন সম্প্রসারণ এবং নতুন কারখানা চালুর ফলে ভবিষ্যতে উৎপাদন আরও বাড়বে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও অগ্রগতি
উভয় প্রতিষ্ঠানই বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে। তা সত্ত্বেও চীনের প্রতিরক্ষা শিল্প বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোতে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে সক্ষম হচ্ছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
বিশ্লেষণ
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ভারত–পাকিস্তান সংঘাত চীনা অস্ত্রের জন্য একটি বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রের পরীক্ষার সুযোগ তৈরি করেছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে তাদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে।
এভিআইসি চেংডুর সাম্প্রতিক আর্থিক সাফল্য তাই শুধু ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি নয়, বরং বৈশ্বিক সামরিক প্রযুক্তি প্রতিযোগিতায় চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবেরও ইঙ্গিত বহন করছে।