
জাতীয় সংসদে উত্থাপিত তথ্যে জানা গেছে, সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সংঘটিত হত্যা, গুম ও নির্যাতনের ঘটনায় সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সারা দেশে মোট ১ হাজার ৮৫৫টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে এ তথ্য জানান আইনমন্ত্রী Asaduzzaman।
ডেপুটি স্পিকার Kaiser Kamal-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে কুড়িগ্রাম–১ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল ইসলামের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, দায়ের করা মামলাগুলোর মধ্যে ৭৯৯টি হত্যা মামলা এবং বাকি ১ হাজার ৫৬টি অন্যান্য ধারায় অন্তর্ভুক্ত।
তদন্ত অগ্রগতি ও বিচারপ্রক্রিয়া
আইনমন্ত্রী জানান, মোট মামলার মধ্যে ১৫৮টির তদন্ত শেষ করে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। এর মধ্যে হত্যা মামলা রয়েছে ৪৮টি এবং অন্যান্য মামলা ১১০টি। বাকি ১ হাজার ৬৯৭টি মামলার তদন্ত এখনও চলমান।
তিনি বলেন, “এত বিপুল সংখ্যক মামলার তদন্ত একটি জটিল ও সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। তবে দ্রুততম সময়ে প্রতিবেদন দাখিলের লক্ষ্যে পুলিশ বিভাগ কাজ করছে।” প্রতিটি মামলায় সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহ ও আইনি প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
জামিন প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী বলেন, এটি সম্পূর্ণরূপে আদালতের এখতিয়ারাধীন। তবে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা প্রতিটি মামলায় সক্রিয়ভাবে জামিনের বিরোধিতা করছেন।
সরকারের অবস্থান
মন্ত্রী বলেন, অতীতে সংঘটিত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি উল্লেখ করেন, “যারা হত্যা, গুম ও নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত, তাদের প্রত্যেককে আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।”
সাবরেজিস্ট্রার পদে শূন্যতা
অধিবেশনে নিবন্ধন অধিদপ্তরের জনবল সংকট নিয়েও তথ্য তুলে ধরা হয়। জামালপুর–৩ আসনের সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল জানান, অনুমোদিত ৪৯৭টি সাবরেজিস্ট্রার পদের মধ্যে বর্তমানে ১১৫টি পদ শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে ১৪টি পদ পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণযোগ্য এবং ১০১টি পদ বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (বিপিএসসি) মাধ্যমে নিয়োগযোগ্য।
তিনি জানান, বিভিন্ন বিসিএস ব্যাচ থেকে মোট ৮০টি পদ পূরণের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে এবং এরই মধ্যে ৪৫তম বিসিএস থেকে ছয়জন প্রার্থীকে সাময়িকভাবে সুপারিশ করা হয়েছে।
বালাম বই সংকট ও বর্তমান অবস্থা
এনসিপির সংসদ সদস্য আতিকুর রহমান মোজাহিদের প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী জানান, ২০২১-২২ অর্থবছরে এক লাখ ৩৫ হাজার বালাম বইয়ের কার্যাদেশ দেওয়া হলেও এক লাখ সরবরাহ করা হয় এবং ৩৫ হাজার বকেয়া থাকে। পরবর্তী দুই অর্থবছরে নতুন করে কার্যাদেশ দেওয়া হয়নি।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১ লাখ ৫০ হাজার বালাম বইয়ের কার্যাদেশ দেওয়া হলেও ২০২৫ সালের ৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৮৩ হাজার ২৩৫টি সরবরাহ বকেয়া ছিল।
মন্ত্রী বলেন, “মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধিদপ্তর সময়মতো সরবরাহ না করায় সংকট তৈরি হয়েছিল।” তবে বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে এবং দেশে ৬৬ হাজার ৫৪৮টি বালাম বই মজুত রয়েছে। পাশাপাশি আরও ১০ হাজার বই মুদ্রণ করা হয়েছে।
সামগ্রিক প্রেক্ষাপট
সংসদে উত্থাপিত এসব তথ্য থেকে স্পষ্ট, একদিকে অতীতের গুরুতর অপরাধের বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে প্রশাসনিক কাঠামোর বিভিন্ন ঘাটতি—বিশেষ করে জনবল সংকট ও সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা—সমাধানে সরকার কাজ করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিচারপ্রক্রিয়ার গতি, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং সুশাসনের বাস্তবায়ন—এই তিনটি ক্ষেত্রই আগামী সময়ে সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।