
জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় বিএনপির বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করেছেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক Nahid Islam। তিনি বলেন, বিএনপির ওপর আর আস্থা রাখা সম্ভব হচ্ছে না—এর পেছনে রয়েছে আর্থিক খাতে বিশৃঙ্খলা, রাজনৈতিক নিয়োগ, সংস্কার প্রক্রিয়া উপেক্ষা এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নে অনীহাসহ নানা অভিযোগ।
বৃহস্পতিবার সংসদ অধিবেশনে তিনি এসব কথা বলেন। এর আগে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর বক্তব্যের জবাব দিয়ে নাহিদ ইসলাম আলোচনায় অংশ নেন।
আর্থিক খাত ও রাজনৈতিক নিয়োগ নিয়ে অভিযোগ
নাহিদ ইসলাম বলেন, দেশের আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগে রাজনৈতিক বিবেচনা প্রাধান্য পেয়েছে।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর রাজনৈতিকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত—এটা অস্বীকার করা যায় না।” একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, ঋণ পুনঃতফসিল প্রক্রিয়ায় ক্ষমতাসীন ঘনিষ্ঠদের সুবিধা দেওয়া হয়েছে, যা আর্থিক খাতে বৈষম্য তৈরি করেছে।
Transparency International Bangladesh (TIB)–এর প্রতিবেদন উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, সংসদ সদস্যদের বড় একটি অংশের ঋণ রয়েছে এবং এর মধ্যে অনেকেই নির্বাচনের আগে পুনঃতফসিল সুবিধা নিয়েছেন।
রাষ্ট্রপতি নিয়ে কঠোর অবস্থান
রাষ্ট্রপতি ইস্যুতে নাহিদ ইসলাম আরও কঠোর অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতির বক্তব্যকে তিনি গুরুত্ব দেননি এবং আগেই তার অপসারণের দাবি জানিয়েছিলেন।
তিনি অতীতের দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংক্রান্ত নিয়োগ ও সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গ টেনে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং তাকে রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব হিসেবে অভিহিত করেন।
সংবিধান ও রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে মতভেদ
সংবিধান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ১৯৭২ সালের সংবিধানকে তিনি “অগণতান্ত্রিক কাঠামোর ধারাবাহিকতা” হিসেবে দেখেন। তার মতে, এটি সরাসরি নির্বাচিত জনগণের প্রতিনিধিদের সম্পূর্ণ অংশগ্রহণে প্রণীত হয়নি।
তিনি আরও দাবি করেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিভিন্ন পর্যায়ে সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো নিয়ে বড় ধরনের বিতর্ক রয়েছে এবং এসব বিষয়ে নতুন করে মূল্যায়ন প্রয়োজন।
গণভোট ও জুলাই সনদ প্রসঙ্গ
নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, “জুলাই জাতীয় সনদ” বাস্তবায়নে বিএনপি অবস্থান পরিবর্তন করেছে এবং গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার বিষয়ে “নোট অব ডিসেন্ট” দিয়ে প্রক্রিয়াকে দুর্বল করেছে।
তিনি বলেন, গণভোট বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও জনগণের মতামতকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি ছিল।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে অভিযোগ
সংসদে দাঁড়িয়ে তিনি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। বিএনপির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, সহিংসতা ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, সরকার এসব বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হচ্ছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, বিভিন্ন থানায় হামলা ও সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতনের ঘটনায়ও যথাযথ আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
পররাষ্ট্রনীতি ও ভারত প্রসঙ্গ
পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক অবশ্যই উন্নয়ন করতে হবে, তবে তা হতে হবে সমতা ও মর্যাদার ভিত্তিতে।
তিনি অভিযোগ করেন, একপক্ষীয় রাজনৈতিক সম্পর্ক দেশের সার্বভৌম স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
জঙ্গিবাদ ও নিরাপত্তা ইস্যু
জঙ্গিবাদ নিয়ে সরকারের বক্তব্যে অসংগতি রয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তার মতে, জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে রাজনৈতিক বিভাজন নয়, বরং ঐক্যবদ্ধ অবস্থান প্রয়োজন।
মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণ–অভ্যুত্থান
মুক্তিযুদ্ধ ও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “জুলাই গণ–অভ্যুত্থান” ও মুক্তিযুদ্ধ পরস্পরবিরোধী নয়, বরং ভিন্ন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের অংশ।
সমাপনী বক্তব্য
নাহিদ ইসলাম তার বক্তব্যের শেষাংশে বলেন, সংসদে সরকারি দলের অবস্থান এবং সংস্কার প্রক্রিয়া নিয়ে অনাগ্রহ তাকে হতাশ করেছে। তবে তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের প্রতি দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে অগ্রসর হবে।
তার এই বক্তব্যের মাধ্যমে সংসদ অধিবেশনে সরকার ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বৃদ্ধি পায় বলে পর্যবেক্ষকদের অভিমত।