
প্রযুক্তি দুনিয়ার অন্যতম আলোচিত নাম ইলন মাস্ক–এর ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই–সংক্রান্ত মামলায় নতুন চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। সাবেক ওপেনএআই বোর্ড সদস্য শিভন জিলিস আদালতে জানিয়েছেন, ২০২০ সালে মাস্ক তাঁকে শুক্রাণু দানের প্রস্তাব দিয়েছিলেন এবং মা হওয়ার ইচ্ছা থেকেই তিনি সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেন।
এই সাক্ষ্য দেওয়া হয় ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডের একটি ফেডারেল আদালতে, যেখানে ওপেনএআই–কে অলাভজনক কাঠামো থেকে মুনাফাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত বাতিল চেয়ে মাস্কের করা মামলার শুনানি চলছে।
আদালতে চমকপ্রদ ব্যক্তিগত স্বীকারোক্তি
শিভন জিলিস আদালতে বলেন, “আমি তখন সত্যিই মা হতে চেয়েছিলাম। ইলন সেই সময় প্রস্তাব দেন এবং আমি তা গ্রহণ করি।”
তার ভাষ্যমতে, ওই সময় মাস্ক তাঁর আশপাশের লোকজনকে সন্তান নেওয়ার বিষয়ে উৎসাহ দিচ্ছিলেন এবং তাঁর নজরে আসে যে জিলিসের কোনো সন্তান নেই। এরপরই তিনি তাঁকে শুক্রাণু দানের প্রস্তাব দেন।
জিলিস জানান, ওই সিদ্ধান্ত ছিল তাঁর ব্যক্তিগত জীবন পরিকল্পনার অংশ, যা তখন স্বাস্থ্যগত জটিলতার কারণে পরিবর্তিত হচ্ছিল।
সম্পর্কের পটভূমি ও চার সন্তানের জন্ম
আদালতের বক্তব্যে জিলিস জানান, প্রায় এক দশক আগে তাঁর সঙ্গে ইলন মাস্ক–এর একটি ‘রোমান্টিক সম্পর্ক’ ছিল। তবে ২০২০ সালে সন্তানের বিষয়ে প্রস্তাব আসার সময় তাঁদের মধ্যে আর সেই সম্পর্ক ছিল না।
বর্তমানে তিনি মাস্কের চার সন্তানের মা। শুরুতে বিষয়টি গোপন রাখার পরিকল্পনা থাকলেও পরে তা প্রকাশ্যে আসে।
ওপেনএআইয়ে ভূমিকা ও তথ্য ফাঁসের অভিযোগ
জিলিস ১৫ বছরেরও বেশি সময় সিলিকন ভ্যালিতে ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি মাস্কের প্রতিষ্ঠান টেসলা এবং নিউরালিংক–এও নির্বাহী পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।
২০১৬ সালে ওপেনএআই প্রতিষ্ঠার পর তিনি উপদেষ্টা হিসেবে যোগ দেন এবং পরে বোর্ড সদস্য হন।
ওপেনএআইয়ের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, মাস্ক ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠানটি ছাড়ার পরও জিলিস তাঁর কাছে গোপনে ওপেনএআই–সংক্রান্ত তথ্য পৌঁছে দিতেন।
তবে জিলিস দাবি করেন, তিনি স্বার্থসংঘাত নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থেকেই দায়িত্ব পালন করেছেন এবং বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের জানা ছিল।
মুনাফাভিত্তিক কাঠামো নিয়ে বিরোধ
মামলার মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো ওপেনএআইকে অলাভজনক থেকে মুনাফাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করার সিদ্ধান্ত।
আদালতে উপস্থাপিত নথি অনুযায়ী, ২০১৭ সাল থেকেই এই কাঠামোগত পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা চলছিল। মাস্ক প্রতিষ্ঠানটির ওপর আরও নিয়ন্ত্রণ চাইছিলেন, এমনকি ওপেনএআইকে টেসলা–এর সঙ্গে যুক্ত করার প্রস্তাবও দিয়েছিলেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
অন্যদিকে ওপেনএআইয়ের সহপ্রতিষ্ঠাতা স্যাম অল্টম্যান এবং গ্রেগ ব্রকম্যান প্রতিষ্ঠানটিকে ভিন্ন কাঠামোয় নেওয়ার পক্ষে ছিলেন।
ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও পেশাগত সীমারেখা
জিলিস আদালতে বলেন, মাস্কের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ব্যক্তিগত হলেও ওপেনএআই–এ তাঁর ভূমিকা ছিল পেশাগত। তবে একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও পেশাগত দায়িত্বের মধ্যে সীমারেখা অনেক সময় অস্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল।
তিনি জানান, ২০২৩ সাল পর্যন্ত মাস্ক, অল্টম্যান এবং ব্রকম্যানের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল সৌহার্দ্যপূর্ণ।
এক জটিল প্রযুক্তি ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব
২০২৩ সালে ইলন মাস্ক নিজস্ব এআই কোম্পানি এক্সএআই চালু করেন, যা সরাসরি ওপেনএআইয়ের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মামলা এখন শুধু ব্যক্তিগত সম্পর্ক নয়, বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ, কর্পোরেট ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং প্রযুক্তি শিল্পের নৈতিক সীমারেখা নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলছে।
সব মিলিয়ে আদালতের এই সাক্ষ্য প্রযুক্তি দুনিয়ায় মাস্ক–ওপেনএআই দ্বন্দ্বকে আরও জটিল ও বহুমাত্রিক করে তুলেছে।