
Mia Golam Parwar-এর লেখা পাঁচটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে উঠে এসেছে দীর্ঘ কারাজীবনের অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক নির্যাতনের স্মৃতি এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ গঠনে জাতীয় ঐক্যের গুরুত্ব। একই মঞ্চে সরকার ও বিরোধী রাজনৈতিক অঙ্গনের নেতারা অতীতের জেল-জুলুম, নির্যাতন এবং গণ-আন্দোলনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে একটি মানবিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্মাণে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান।
বুধবার বিকেলে National Press Club-এর আবদুস সালাম মিলনায়তনে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে মোড়ক উন্মোচন করা হয় মিয়া গোলাম পরওয়ারের লেখা পাঁচটি বইয়ের। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান Prachchad Prokashoni থেকে বইগুলো প্রকাশিত হয়েছে।
যেসব বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়েছে
মোড়ক উন্মোচন হওয়া বইগুলো হলো—
লৌহকপাটের অন্যজীবন
মুমিনের শ্রেষ্ঠ হাতিয়ার সালাত ও সবর
মুমিনের জীবনে নিয়ামত ও মুসিবত
ঈমানের উন্নতি
কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ
এর মধ্যে লৌহকপাটের অন্যজীবন বইটিতে বিভিন্ন সময়ে কারাগারে থাকার অভিজ্ঞতা, সহবন্দী রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে স্মৃতি এবং বন্দিজীবনের নানা অনুষঙ্গ তুলে ধরা হয়েছে।
কারাগারে লেখা, পরে বই আকারে প্রকাশ
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, দীর্ঘ কারাজীবনে তিনি নিয়মিত ডায়েরি লিখতেন। বিভিন্ন জেলে স্থানান্তরের কারণে সেই ডায়েরিগুলো সংরক্ষণ করা ছিল অত্যন্ত কঠিন।
তিনি বলেন, বন্দি অবস্থায় কখনো ভাবেননি যে একদিন মুক্ত হয়ে এসব লেখা বই আকারে প্রকাশ করতে পারবেন। সে সময় অনেকের মনেই আশঙ্কা ছিল, হয়তো আর মুক্তি মিলবে না।
তিনি আরও জানান, কারাগারে সহবন্দী ATM Azharul Islam-এর বিভিন্ন আলোচনা ও বক্তব্যও বইয়ের বিভিন্ন অংশে স্থান পেয়েছে।
ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, দেশের মানুষ যেন আর কখনো জুলুম-নির্যাতনের অন্ধকার সময়ের মুখোমুখি না হয়। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে জাতীয় স্বার্থে সব রাজনৈতিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যেতে হবে।
শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানির কারাজীবনের স্মৃতিচারণা
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পানিসম্পদমন্ত্রী ও বিএনপি নেতা Shahid Uddin Chowdhury Annie। বক্তব্যে তিনি রাজনৈতিক জীবনে বারবার কারাবরণ ও নির্যাতনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, Hussain Muhammad Ershad-বিরোধী আন্দোলনের সময় প্রথম জেলে যান। পরে Sheikh Hasina-র আমলে ১১ থেকে ১২ বার কারাবরণ করেন। এর মধ্যে একবার টানা সাড়ে ছয় মাস কারাগারে ছিলেন। এছাড়া জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের সময়ও ১২ দিন কারাগারে কাটান।
মীর কাসেম আলীকে কাঁঠাল পাঠানোর স্মৃতি
ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণায় শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেন, এক-এগারোর সময় কাশিমপুর কারাগারে Mir Quasem Ali-র সঙ্গে তাঁর দেখা হয়েছিল। কারাগারের সেলে থাকা কাঁঠালগাছ থেকে তিনি নিয়মিত কাঁঠাল পাঠাতেন, কারণ মীর কাসেম আলী কাঁঠাল খেতে পছন্দ করতেন।
মুক্তির আগে শেষ ভোজ
এ্যানি আরও জানান, একবার বিএনপি ও জামায়াতের জ্যেষ্ঠ নেতারা তাঁর মুক্তি উপলক্ষে বিশেষ খাবারের আয়োজন করতে বলেন। তিনি দেশি মুরগির মাংস দিয়ে খাবারের ব্যবস্থা করেন। খাওয়াদাওয়ার পরই সন্ধ্যায় প্রশাসন তাঁদের বিভিন্ন কারাগারে স্থানান্তর করে দেয়, যাতে এ ধরনের সমাবেশ আর না হয়। সেদিন রাতেই তিনি জামিনে মুক্তি পান।
শফিকুর রহমান ছিলেন নামাজের ইমাম
কারাজীবনের স্মৃতি টেনে তিনি বলেন, জামায়াতের বর্তমান আমির Shafiqur Rahman তাঁদের নামাজে ইমামতি করতেন। মিয়া গোলাম পরওয়ার নিয়মিত তাঁকে নাশতায় আমন্ত্রণ জানাতেন।
সংসদ ও রাজপথে একই অবস্থানের আহ্বান
জামায়াত নেতাদের উদ্দেশে শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেন, সংসদের ভেতরে ও বাইরে বক্তব্যে যেন কোনো পার্থক্য না থাকে। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই যেমন একসঙ্গে করা হয়েছে, তেমনি সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণেও সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
নতুন প্রজন্মের জন্য ইতিহাস সংরক্ষণ
এ টি এম আজহারুল ইসলাম বলেন, এই বইগুলোর উদ্দেশ্য শুধু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলে ধরা নয়; বরং নতুন প্রজন্মকে স্বৈরাচার, নির্যাতন ও গণতন্ত্রের সংগ্রামের বাস্তবতা সম্পর্কে জানানো।
তিনি বলেন, সত্য, ন্যায় ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে কী ধরনের ত্যাগ স্বীকার করতে হয়, তা তরুণদের জানা জরুরি। লেখনীর মাধ্যমে জাতিকে জাগ্রত করার শক্তি রয়েছে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত অন্যান্য অতিথি
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন—
Ehsanul Mahbub Zubair
Nurul Islam Bulbul
Mir Ahmad Bin Quasem Arman
Md. Rashedul Islam
Abdul Jabbar
Bangladesh Sramik Kallyan Federation-এর সভাপতি আতিকুর রহমান
Islami Chhatra Shibir-এর সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন Rajiful Hasan।
ইতিহাস, স্মৃতি ও ভবিষ্যতের বার্তা
অনুষ্ঠানজুড়ে উঠে আসে রাজনৈতিক সংগ্রাম, কারাবন্দিত্ব এবং পারস্পরিক সহমর্মিতার নানা স্মৃতি। বক্তাদের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়, অতীতের অভিজ্ঞতাকে দলিলবদ্ধ করা শুধু ব্যক্তিগত স্মৃতির সংরক্ষণ নয়; বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ইতিহাসের শিক্ষা পৌঁছে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।