
স্পেনের উপকূল থেকে প্রায় ৬০ মাইল দূরে ভূমধ্যসাগরে রুশ মালিকানাধীন একটি কার্গো জাহাজ ডুবে যাওয়ার ঘটনাকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে রহস্য ও উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএনের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, জাহাজটিতে সাবমেরিনে ব্যবহৃত দুটি পারমাণবিক চুল্লি বহন করা হচ্ছিল, যা সম্ভবত উত্তর কোরিয়ায় পাঠানোর উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছিল।
২০২৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর ‘উরসা মেজর’ নামে পরিচিত ওই জাহাজটি ধারাবাহিক বিস্ফোরণের পর ডুবে যায়। ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে এখন প্রশ্ন উঠছে—এটি কি নিছক দুর্ঘটনা, নাকি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কোনো গোপন সামরিক অভিযান?
যাত্রাপথ ও সন্দেহজনক কার্গো
তদন্ত অনুযায়ী, জাহাজটি ২০২৪ সালের ২ ডিসেম্বর রাশিয়ার উস্ত-লুগা বন্দরে নোঙর করে এবং পরে সেন্ট পিটার্সবার্গের টার্মিনাল থেকে যাত্রা শুরু করে। গন্তব্য হিসেবে প্রথমে ভ্লাদিভোস্টকের নাম উল্লেখ থাকলেও প্রকৃত গন্তব্য নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়।
নথিপত্রে উল্লেখ ছিল—
১২৯টি খালি কনটেইনার
দুটি বড় ক্রেন
দুটি বড় “ম্যানহোল কভার”
তবে স্যাটেলাইট চিত্র ও ভিডিও বিশ্লেষণে দেখা যায়, কনটেইনারগুলো জাহাজের নিচের অংশে বিশেষভাবে ফাঁকা জায়গা রেখে সাজানো হয়েছিল, যা সন্দেহ আরও বাড়ায়।
পর্তুগিজ নৌবাহিনী ও অন্যান্য ইউরোপীয় সংস্থা জাহাজটিকে আটলান্টিক ও ভূমধ্যসাগরীয় পথে ট্র্যাক করছিল। কিছু সময় রুশ নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজও এটিকে নিরাপত্তা দিচ্ছিল।
প্রথম সংকেত: গতি হ্রাস ও জরুরি বার্তা
স্পেনের কার্টাগেনা বন্দরের সামুদ্রিক কর্তৃপক্ষ জানায়, স্প্যানিশ জলসীমায় প্রবেশের কিছু ঘণ্টা পর জাহাজটির গতি হঠাৎ কমে যায়। প্রথমে ক্রুদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা বিপদের কথা অস্বীকার করেন।
কিন্তু ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পরিস্থিতি বদলে যায়। ২৩ ডিসেম্বর স্থানীয় সময় ১১:৫৩ মিনিটে জাহাজটি থেকে জরুরি সংকেত পাঠানো হয়।
বিস্ফোরণ ও জাহাজডুবি
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, জাহাজটির ডান পাশে একাধিক বিস্ফোরণ ঘটে। এগুলো ইঞ্জিন রুমের কাছাকাছি ছিল বলে ধারণা করা হয়।
ফলাফল:
২ জন ক্রু নিহত
১৪ জন জীবিত উদ্ধার
জাহাজটি এক পাশে কাত হয়ে যায়
এর কিছু সময় পর জাহাজটি পুরোপুরি ডুবে যায়।
স্পেনের ভূকম্পন পর্যবেক্ষণ সংস্থা একই সময়ে চারটি অস্বাভাবিক ভূকম্পন সংকেত রেকর্ড করে, যা পানির নিচে বিস্ফোরণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে ধারণা করা হয়।
“ম্যানহোল কভার” নাকি পারমাণবিক চুল্লি?
সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয় হলো জাহাজে থাকা কার্গো।
রুশ ক্যাপ্টেন তদন্তকারীদের জানান, এগুলো সাবমেরিনে ব্যবহৃত পারমাণবিক চুল্লির অংশ হতে পারে। যদিও তিনি দাবি করেন, এতে পারমাণবিক জ্বালানি ছিল না।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এসব যন্ত্রাংশ উত্তর কোরিয়ার একটি সাবমেরিন প্রকল্পে ব্যবহারের জন্য পাঠানো হচ্ছিল।
রাশিয়ার মালিক প্রতিষ্ঠান পরে ঘটনাটিকে “সন্ত্রাসী হামলা” বলে উল্লেখ করে।
পশ্চিমাদের গোপন অভিযান তত্ত্ব
সিএনএনের প্রতিবেদনে একাধিক সূত্র দাবি করেছে, জাহাজটি সম্ভবত কোনো পশ্চিমা সামরিক অভিযানের লক্ষ্যবস্তু ছিল, যাতে রাশিয়ার পারমাণবিক প্রযুক্তি উত্তর কোরিয়ার হাতে পৌঁছাতে না পারে।
তবে এ বিষয়ে কোনো দেশই আনুষ্ঠানিকভাবে দায় স্বীকার করেনি।
বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করে, অত্যাধুনিক টর্পেডো বা পানির নিচে স্থাপিত লিম্পেট মাইন ব্যবহার করে বিস্ফোরণ ঘটানো হতে পারে।
পরবর্তী বিস্ফোরণ ও নজরদারি
ডুবে যাওয়ার কয়েক দিন পরও ঘটনাস্থলে আরও বিস্ফোরণের তথ্য পাওয়া যায়। রুশ নৌবাহিনীর একটি “গবেষণা জাহাজ” ঘটনাস্থলে গিয়ে দীর্ঘ সময় অবস্থান করে, যা পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থার নজর কাড়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক শনাক্তকারী বিশেষ বিমানও দুই দফা ওই এলাকায় উড়ে যায় বলে জানা গেছে।
উত্তর কোরিয়া সংযোগ ও ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
বিশ্লেষকদের মতে, যদি সত্যিই পারমাণবিক চুল্লি উত্তর কোরিয়ায় পাঠানো হয়ে থাকে, তবে এটি রাশিয়া–উত্তর কোরিয়া সামরিক সহযোগিতার নতুন মাত্রা নির্দেশ করে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের প্রযুক্তি স্থানান্তর বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
এখনো অমীমাংসিত রহস্য
জাহাজটি বর্তমানে সমুদ্রের প্রায় ২,৫০০ মিটার গভীরে পড়ে আছে। এত গভীরতা থেকে ব্ল্যাক বক্স উদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব বলে জানিয়েছে স্পেনের তদন্ত সংস্থা।
এদিকে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—
জাহাজটি কীভাবে ধ্বংস হলো?
এটি কি সত্যিই গোপন সামরিক হামলা ছিল?
নাকি প্রযুক্তি পাচারের একটি ব্যর্থ অভিযান?
তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত উরসা মেজর ডুবে যাওয়ার রহস্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রেই থাকবে।