
তথ্যসূত্র: দ্য ওয়ার
ভারতে সংখ্যালঘুদের অধিকার, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং আইনের শাসন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নেদারল্যান্ডসের প্রধানমন্ত্রী রব জেটেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের আগে স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব উদ্বেগের কথা তুলে ধরেন। তবে ভারতীয় পক্ষ দাবি করেছে, আনুষ্ঠানিক বৈঠকে এ বিষয়গুলো আলোচনায় আসেনি।
মোদির দুই দিনের নেদারল্যান্ডস সফরে দুই দেশের সম্পর্ককে কৌশলগত অংশীদারত্বে উন্নীত করার ঘোষণা দেওয়া হয়। সফরকালে একাধিক বৈঠক ও কর্মসূচিতে অংশ নেন দুই নেতা।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ডি ভল্কস্ক্রান্ট ও এনআরসি–র বরাতে জানা যায়, ক্যাটশুইসে নিজের সরকারি বাসভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে জেটেন বলেন, মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকারের আমলে ভারতে সংখ্যালঘুদের অধিকার ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যদেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
তিনি বলেন, “বিষয়টি শুধু সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নয়, সংখ্যালঘুদের অধিকারের প্রশ্নও জড়িত। বিশেষ করে মুসলিম সম্প্রদায় তীব্র চাপের মধ্যে রয়েছে। পাশাপাশি অন্যান্য ছোট সম্প্রদায়ও একই ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।”
জেটেন আরও বলেন, এসব উদ্বেগ ভারত সরকারের সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ে নিয়মিতভাবে উত্থাপন করা হয়েছে। তার মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ভারতের মধ্যে সম্ভাব্য মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি শুধু অর্থনৈতিক সম্পর্ক নয়, বরং মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও আইনের শাসন নিয়েও আলোচনা সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তবে বৈঠকের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে জেটেন এসব বিষয় উল্লেখ করেননি। সেখানে তিনি শুধু হরমুজ প্রণালি পরিস্থিতি, জ্বালানি মূল্য এবং অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানান।
নৈশভোজ শেষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এক ডাচ সাংবাদিক ভারতে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সংখ্যালঘু অধিকার নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের উদ্বেগ সম্পর্কে জানতে চান। বিশেষ করে মুসলিম ও অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয় ভারতের প্রতিনিধিদের কাছে।
সফরের সময় নেদারল্যান্ডসের গণমাধ্যমে বিশেষভাবে আলোচনায় আসে ইনসিয়া হেমানি নামের এক ডাচ শিশু সংক্রান্ত দীর্ঘস্থায়ী একটি মামলা।
২০১৬ সালে মাত্র দুই বছর বয়সে আমস্টারডাম থেকে অপহরণের অভিযোগ ওঠে ইনসিয়ার বাবা শাহজাদ হেমানির বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, শিশুটিকে জার্মানির মাধ্যমে ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়। ডাচ আদালত শিশুটির মা নাদিয়া রশিদকে অভিভাবকত্ব দিলেও প্রায় এক দশক ধরে তাদের কোনো যোগাযোগ নেই। আদালত অনুপস্থিত অবস্থায় বাবাকে আট বছরের বেশি কারাদণ্ড দেয়, যা পরে সুপ্রিম কোর্টেও বহাল থাকে।
ভারত ১৯৮০ সালের আন্তর্জাতিক শিশু অপহরণ সংক্রান্ত হেগ কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী নয়। ফলে দ্বিপক্ষীয় ও কূটনৈতিক পর্যায়ে একাধিকবার আলোচনা হলেও বিষয়টির সমাধান হয়নি।
মোদির সফরের আগে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ডাচ সদস্যরা এবং দেশটির নিম্নকক্ষ ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে ইনসিয়াকে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সহযোগিতার আহ্বান জানিয়ে চিঠি পাঠান। একই সঙ্গে নেদারল্যান্ডসের পার্লামেন্ট একটি প্রস্তাব পাস করে, যেখানে রাজা উইলেম-আলেকজান্ডারকে মোদির সঙ্গে বৈঠকে বিষয়টি উত্থাপনের অনুরোধ জানানো হয়।
মোদি যখন রাজপ্রাসাদে পৌঁছান, তখন বাইরে বিক্ষোভকারীরা ইনসিয়াকে দেশে ফিরিয়ে আনার দাবিতে অবস্থান নেন। ডাচ গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, শিশুটির মা নাদিয়া রশিদ হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, যাতে লেখা ছিল—“ইনসিয়া কবে বাড়ি ফিরবে?”
এ বিষয়ে জেটেন জানান, তিনি শিগগিরই একটি ডাচ প্রতিনিধিদল ভারতে পাঠানোর উদ্যোগ নিচ্ছেন, যাতে সর্বোচ্চ পর্যায়ে আলোচনা করে সমাধানের চেষ্টা করা যায়।
উল্লেখ্য, নেদারল্যান্ডস সফর ছিল নরেন্দ্র মোদির পাঁচ দেশের সফরসূচির অংশ। এর আগে তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাত, সুইডেন, নরওয়ে ও ইতালি সফর করেন। ২০১৭ সালের পর এটি ছিল তাঁর প্রথম নেদারল্যান্ডস সফর।