
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ব্যাংক খাতে ব্যাপক অনিয়ম, ঋণ জালিয়াতি ও অর্থপাচারের ধারাবাহিকতা এখনো পুরোপুরি থামেনি বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)–এর আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি অভিযোগ করে বলেন, অতীতের মতোই নতুন করে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী তৈরির প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বৃহস্পতিবার (তারিখ উল্লেখিত নয়) রাত রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইডিইবি) মিলনায়তনে আয়োজিত এক আলোচনায় সমাপনী বক্তব্যে এসব মন্তব্য করেন তিনি। ‘বৈশ্বিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের বাজেট: কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও সংস্কারে অগ্রাধিকার এবং জনপ্রত্যাশার বৈষম্যহীন সমৃদ্ধ বাংলাদেশ’ শীর্ষক এই আলোচনা আয়োজন করে এনসিপির ছায়া বাজেট প্রণয়ন কমিটি।
পাঁচ পর্বের ধারাবাহিক আলোচনার সমাপনী অধিবেশনে নাহিদ ইসলাম দেশের অর্থনৈতিক সংস্কার, বিনিয়োগ পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, রাজনৈতিক ঐক্য ও আস্থার সংকট দূর না হলে দেশের অর্থনৈতিক সংকট কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।
ব্যাংক খাত নিয়ে কঠোর সমালোচনা
নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, বিগত সময়ের ‘ফ্যাসিস্ট শাসনামলে’ কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে অস্বাভাবিকভাবে বড় অঙ্কের ঋণ দেওয়া হয়েছে, যার বড় অংশ বিদেশে পাচার হয়েছে এবং অনেক ঋণই খেলাপিতে পরিণত হয়েছে।
তিনি বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতিতেও মনে হচ্ছে নতুন করে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী তৈরির প্রতিযোগিতা চলছে। এই সরকারের এস আলম কে হবে, সালমান এফ রহমান কে হবে—এই ধরনের প্রতিযোগিতার ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে।”
তার দাবি, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ব্যাংক খাত ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে আস্থা সংকট আরও গভীর হবে।
রাজনৈতিক সংস্কার ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন
এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, অর্থনৈতিক সংস্কারকে রাজনৈতিক সংস্কারের সঙ্গে সমান্তরালভাবে এগিয়ে নিতে হবে। তাঁর মতে, সংসদের প্রথম অধিবেশনে ঘোষিত রাজনৈতিক সংস্কারের অঙ্গীকার বাস্তবায়িত না হওয়ায় অর্থনৈতিক সংস্কারও এগোচ্ছে না।
তিনি বলেন, “আমরা দুই ধাপ পিছিয়ে যাচ্ছি। রাজনৈতিক সংস্কার ছাড়া অর্থনৈতিক সংস্কার কার্যকরভাবে সম্ভব নয়।”
বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক আস্থার সংকট
নাহিদ ইসলাম বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হলে আগে দেশীয় ব্যবসায়ীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। তিনি অভিযোগ করেন, কিছু ক্ষেত্রে বিতর্কিত ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রাখা হচ্ছে, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
তিনি আরও বলেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা ব্যাংক থেকে সহজে ঋণ পাচ্ছেন না, অথচ বড় গোষ্ঠীগুলো রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে বিপুল ঋণ নিচ্ছে—এ ধরনের বৈষম্য অর্থনীতিকে দুর্বল করছে।
তার ভাষায়, “কৃষক পাঁচ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে সময়মতো পরিশোধ না করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়, কিন্তু বড় ঋণখেলাপিদের ক্ষেত্রে ভিন্ন আচরণ দেখা যায়।”
বাজেট ও সংস্কার প্রস্তাব
আলোচনায় নাহিদ ইসলাম বলেন, আগামী বাজেটে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও গবেষণা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে দুর্নীতি ও অর্থপাচার রোধে কার্যকর কাঠামোগত সংস্কার জরুরি।
তিনি বলেন, শুধু অর্থনৈতিক নীতি নয়, বরং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে একটি স্থিতিশীল বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
অনুষ্ঠান ও অংশগ্রহণ
অনুষ্ঠান শুরু হয় বিকেল ৩টা ৪০ মিনিটে কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে। পরে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। উদ্বোধনী বক্তব্য দেন এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন।
এরপর ধারাবাহিকভাবে পাঁচটি পর্বে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়—অর্থনৈতিক সংস্কার ও মধ্যম আয়ের দেশ, শিক্ষা ও চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা, কৃষি ও শিল্প বহুমুখীকরণ এবং টেকসই উন্নয়ন ও জ্বালানি সার্বভৌমত্ব।
অনুষ্ঠানে দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী ও নীতিনির্ধারকরা উপস্থিত ছিলেন।