
জার্মানির রাজধানী বার্লিন যেন রোববার পরিণত হয়েছিল বিশ্বসংস্কৃতির এক বর্ণিল মিলনমেলায়। আন্তসংস্কৃতি উৎসব উপলক্ষে শহরের প্রধান সড়কজুড়ে নেমেছিল লাখো মানুষের ঢল। বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি, সংগীত, নৃত্য ও ঐতিহ্যের প্রদর্শনীতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো শহর। আর এ আয়োজনে বরাবরের মতোই উজ্জ্বল উপস্থিতি ছিল প্রবাসী বাংলাদেশিদের।
রঙিন শাড়ি, লুঙ্গি, ফতুয়া, দেশীয় বাদ্যযন্ত্র ও লোকসংগীতের তালে তালে প্রবাসী বাংলাদেশিরা বার্লিনের রাজপথ মাতিয়ে তোলেন। তাঁদের পরিবেশনা ও সাংস্কৃতিক উপস্থাপনা দর্শকদের দৃষ্টি কাড়ে এবং বিপুল করতালি অর্জন করে।
জার্মান ভাষায় ‘কার্নিভ্যাল ডের কুলটুর’ নামে পরিচিত এই আয়োজনের এ বছর ৩০ বছর পূর্তি হয়েছে। ১৯৯৬ সালে জার্মানিতে বর্ণবাদ, জাতিগত বৈষম্য এবং অভিবাসীবিদ্বেষের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে উৎসবটির যাত্রা শুরু হয়েছিল। শুরুতে এটি ছিল প্রতীকী প্রতিবাদধর্মী একটি সাংস্কৃতিক উদ্যোগ। সময়ের পরিক্রমায় সেটি এখন বিশ্বসংস্কৃতির বিশাল উৎসবে পরিণত হয়েছে।
তবে আয়োজকেরা বলছেন, উৎসবের মূল বার্তা আজও একই রয়ে গেছে। বরং ইউরোপজুড়ে অভিবাসীবিরোধী জাতীয়তাবাদী ও কট্টরপন্থী রাজনীতির উত্থানের প্রেক্ষাপটে এই সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
উৎসব উপলক্ষে রোববার বার্লিনের প্রাণকেন্দ্র ফ্রাঙ্কফুর্ট অ্যাভিনিউ থেকে কার্ল মার্ক্স অ্যাভিনিউ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটারজুড়ে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা ও সাংস্কৃতিক আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, রাস্তার দুই পাশে প্রায় আট লাখ মানুষ সমবেত হন।
এই মহামিলনমেলায় ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকা ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশের মানুষ নিজ নিজ সংস্কৃতি তুলে ধরেন। বর্ণিল পোশাক, নাচ, গান ও বাদ্যযন্ত্রের ছন্দে পুরো বার্লিন যেন রূপ নেয় এক আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক মঞ্চে।
প্রতিবছরের মতো এবারও বেঙ্গলিশে কুলটর ফোরাম–এর উদ্যোগে উৎসবে অংশ নেন জার্মানপ্রবাসী বাংলাদেশিরা। নারীরা লাল শাড়ি, টিপ, ফুল ও দেশীয় অলংকারে সেজে অংশ নেন। অন্যদিকে পুরুষেরা লুঙ্গি, ফতুয়া ও মাথায় গামছা পরে ঐতিহ্যবাহী বাঙালি সংস্কৃতির আবহ তৈরি করেন।
দেশাত্মবোধক গান, লোকসংগীত ও আধুনিক গানের সঙ্গে তাঁদের পরিবেশনা উৎসবে আলাদা মাত্রা যোগ করে। শোভাযাত্রা এগিয়ে যাওয়ার সময় রাস্তার দুই পাশের দর্শকেরা করতালি ও উচ্ছ্বাসে বাংলাদেশি দলের প্রতি সমর্থন জানান।
বেঙ্গলিশে কুলটর ফোরাম জানিয়েছে, এবারের পরিবেশনার মূল প্রতিপাদ্য ছিল বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী মঙ্গল শোভাযাত্রা। এর মাধ্যমে ধর্মীয় মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে বাঙালির সাংস্কৃতিক অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে।
এ ছাড়া উৎসবের আগের দিন শনিবার বার্লিনে ‘বাংলার উঠান’ নামে একটি সংগঠনের উদ্যোগে আরেকটি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে শিশু-কিশোরেরা রঙিন দেশীয় পোশাকে অংশ নেয় এবং বাংলা সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক তুলে ধরে।
২০০২ সাল থেকে নিয়মিতভাবে প্রবাসী বাংলাদেশিরা এই আন্তর্জাতিক উৎসবে অংশ নিয়ে আসছেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের অংশগ্রহণের পরিসর ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনার জৌলুশও বেড়েছে।
উৎসবের আয়োজকেরা জানিয়েছেন, বর্তমানে জার্মানিতে প্রায় এক কোটি অভিবাসী বসবাস করছেন। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক পরিচয় ও বৈচিত্র্য তুলে ধরার অন্যতম বড় প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠেছে ‘কার্নিভ্যাল ডের কুলটুর’।
তাঁদের মতে, ক্রমবর্ধমান বর্ণবাদ, ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও অভিবাসীবিদ্বেষের প্রেক্ষাপটে এমন সাংস্কৃতিক ঐক্যের বার্তা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই নানা ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষ বার্লিনের রাজপথে একত্র হয়ে সহাবস্থান, সম্প্রীতি ও মানবিকতার পক্ষে নিজেদের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন।