
রয়টার্স
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণকারী ইরানি সংস্থার ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইরানের নিয়ন্ত্রণাধীন ‘পার্সিয়ান গালফ স্ট্রেইট অথরিটি’ নামের একটি সংস্থাকে লক্ষ্য করে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
বুধবার ঘোষিত এ নিষেধাজ্ঞার ফলে সংস্থাটির সঙ্গে যেকোনো ধরনের বাণিজ্যিক বা আর্থিক সম্পর্ক স্থাপনকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)-কে সহযোগিতা হিসেবে বিবেচনা করবে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
কী এই ‘পার্সিয়ান গালফ স্ট্রেইট অথরিটি’
মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ‘পার্সিয়ান গালফ স্ট্রেইট অথরিটি’ ইরান কর্তৃক গঠিত একটি প্রশাসনিক সংস্থা, যা হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের অনুমতি ও নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে।
বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানির প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই নৌপথের নিয়ন্ত্রণকে বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
নিষেধাজ্ঞার পটভূমি
মার্কিন প্রশাসনের দাবি, ইরান এই প্রণালিকে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। ওয়াশিংটনের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণের নামে বিভিন্ন ধরনের মাশুল ও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন লঙ্ঘনের শামিল।
মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় জানায়, যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি এই সংস্থার সঙ্গে কাজ করে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইআরজিসি-সংশ্লিষ্ট সহায়তা প্রদানের অভিযোগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হতে পারে।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী এক বিবৃতিতে বলেন, ইরান বৈশ্বিক বাণিজ্যপথে “জোরপূর্বক অর্থ আদায়ের চেষ্টা” করছে এবং এই পদক্ষেপের মাধ্যমে দেশটির অর্থনৈতিক চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে উত্তেজনা
বিশ্বের অন্যতম কৌশলগত এই নৌপথ ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে। সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। এরপর থেকে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ ব্যবস্থায় অস্থিরতা দেখা দেয় বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব
হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বে মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয়। ফলে এই রুটে যেকোনো ধরনের বিঘ্ন সরাসরি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রণালির নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চলমান রাজনৈতিক টানাপোড়েন ভবিষ্যতে তেলের দাম ও বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থায় আরও অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
নতুন মানচিত্র প্রকাশ ও প্রতিক্রিয়া
গত সপ্তাহে ‘পার্সিয়ান গালফ স্ট্রেইট অথরিটি’ একটি মানচিত্র প্রকাশ করে, যেখানে হরমুজ প্রণালির দুই পাশে বিস্তৃত জলসীমার ওপর ইরানের মালিকানা দাবি করা হয়।
এই মানচিত্র প্রকাশকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে নতুন করে কূটনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
সামনের পরিস্থিতি
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিষেধাজ্ঞার এই নতুন ধাপ যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির মতো কৌশলগত রুটকে কেন্দ্র করে যেকোনো সিদ্ধান্ত বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে সক্ষম।
বর্তমান পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক সমাধানের কোনো উদ্যোগ না এলে সামুদ্রিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।