
১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোর। চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসের নিস্তব্ধতা হঠাৎ ভেঙে পড়ে গুলির শব্দে। কিছুক্ষণের মধ্যেই বদলে যায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গতিপথ। সেই ভোরেই নিহত হন রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান। চার দশকের বেশি সময় পার হলেও ওই ঘটনার অনেক অধ্যায় আজও রহস্যে ঢাকা।
চট্টগ্রামের তৎকালীন জেলা প্রশাসক জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরীর বর্ণনায় উঠে এসেছে সেই ভয়াবহ মুহূর্তের প্রত্যক্ষ চিত্র। ভোরের দিকে গুলির শব্দে ঘুম ভেঙে যায় তাঁর। পরে তাঁকে জানানো হয়, সার্কিট হাউসের দিক থেকে ভারী অস্ত্রের গুলির শব্দ আসছে। কিছুক্ষণ পরই নিশ্চিত হওয়া যায়—রাষ্ট্রপতির ওপর হামলা হয়েছে।
সকালে তিনি সার্কিট হাউসে পৌঁছে দেখেন, প্রধান ফটক অরক্ষিত। কোনো কার্যকর নিরাপত্তা নেই। ওপরতলার কক্ষের দরজার কাছে পড়ে আছে সাদা কাপড়ে ঢাকা মরদেহ—জিয়াউর রহমানের। সেই দৃশ্য শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভয়াবহ ভাঙনের প্রতীক হয়ে ওঠে।
১৯৮১ সালের মে মাসের শেষ সপ্তাহে জিয়াউর রহমান চট্টগ্রাম সফরে আসেন। সফরটি ছিল হঠাৎ নির্ধারিত এবং রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল।
সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল স্থানীয় বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব নিরসন। চট্টগ্রাম বিএনপি তখন দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। এক পক্ষের পেছনে ছিলেন তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী জামালউদ্দীন আহমেদ, অন্য পক্ষকে সমর্থন দিচ্ছিলেন ডেপুটি স্পিকার সুলতান আহমেদ চৌধুরী। এই বিভাজন শুধু রাজনৈতিক বিরোধেই সীমাবদ্ধ ছিল না; স্থানীয় পর্যায়ে সংঘর্ষ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটিয়েছিল।
সফরসূচি ছিল সংক্ষিপ্ত। ২৯ মে রাষ্ট্রপতি চট্টগ্রাম পৌঁছে সার্কিট হাউসে অবস্থান নেন এবং স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। বৈঠকটি দীর্ঘ সময় ধরে চলে, মধ্যরাত পর্যন্ত চলমান ছিল।
সেই রাতে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির তৎকালীন শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন নেতা এবং প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। রাজনৈতিক অস্থিরতা নিরসনের চেষ্টা চলছিল, কিন্তু সমাধান আসেনি।
পরদিন ভোরেই ঘটে যায় ইতিহাসের মোড় ঘোরানো ঘটনা।
সরকারি ও প্রত্যক্ষদর্শী বর্ণনা অনুযায়ী, ভোর চারটার দিকে একদল সশস্ত্র সেনাসদস্য সার্কিট হাউসে প্রবেশ করে। মুহূর্তের মধ্যে শুরু হয় গুলিবর্ষণ।
হামলা এত দ্রুত ও সমন্বিত ছিল যে, রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই জিয়াউর রহমানসহ কয়েকজন নিহত হন বলে জানা যায়।
ঘটনার পর চট্টগ্রাম বেতার থেকে ঘোষণা আসে—একটি সামরিক অভ্যুত্থানের অংশ হিসেবে রাষ্ট্রপতিকে হত্যা করা হয়েছে এবং একটি “বিপ্লবী পরিষদ” ক্ষমতা গ্রহণের চেষ্টা করছে।
হামলার পরপরই চট্টগ্রামে সান্ধ্য আইন জারি হয়। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। ঢাকার সঙ্গে টেলিযোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সড়ক ও আকাশপথ কার্যত বন্ধ হয়ে পড়ে।
চট্টগ্রাম কয়েক ঘণ্টার জন্য কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে বিচ্ছিন্ন এক অঞ্চলে পরিণত হয়।
ঢাকায় দ্রুত সাংবিধানিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সেনা ও প্রশাসনের শীর্ষ নেতৃত্ব তাঁর প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করে।
এরপর জরুরি অবস্থা জারি করা হয় এবং জাতীয় শোক ঘোষণা করা হয়।
হত্যাকাণ্ডের পর জিয়াউর রহমানের মরদেহ কোথায় ছিল, তা নিয়েও তৈরি হয় বিভ্রান্তি।
প্রথমদিকে মরদেহ সার্কিট হাউসেই ছিল। পরে সেনাবাহিনীর একটি দল সেটি সরিয়ে নেয় বলে বিভিন্ন বর্ণনায় উঠে আসে। পরে মরদেহ রাঙ্গুনিয়ার পাহাড়ি এলাকায় গোপনে দাফন করা হয়।
পরবর্তীতে স্থানীয় তথ্য ও অনুসন্ধানের ভিত্তিতে মরদেহ উদ্ধার করে আবার শনাক্ত করা হয়।
এই হত্যাকাণ্ডের সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায়গুলোর একটি মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরের ভূমিকা।
চট্টগ্রাম ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি হিসেবে তিনি তখন গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে ছিলেন। বিভিন্ন গবেষণা ও বইয়ে তাঁর নাম উঠে আসে বিদ্রোহের সঙ্গে যুক্ত সম্ভাব্য ভূমিকার প্রসঙ্গে।
তবে তাঁর ঘনিষ্ঠদের বক্তব্য এবং পরবর্তী কিছু গবেষণায় দাবি করা হয়, তাঁর ভূমিকা নিয়ে একাধিক মতপার্থক্য রয়েছে।
ঘটনার পর তিনি আত্মসমর্পণ করেন, কিন্তু পরে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে তাঁর মৃত্যু ঘটে—যা এখনো বিতর্কিত এবং অমীমাংসিত অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত।
হত্যাকাণ্ডের পর সামরিক আদালতে দ্রুত বিচার সম্পন্ন হয়। ১৩ জন সেনা কর্মকর্তার ফাঁসি কার্যকর করা হয়। আরও কয়েকজনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়।
তবে মানবাধিকার ও বিচার বিশ্লেষকদের একটি অংশ বরাবরই অভিযোগ করে এসেছে যে, এই বিচার ছিল দ্রুত এবং সীমিত পরিসরের, যেখানে পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধানের সুযোগ কম ছিল।
বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়াও প্রশ্নের জন্ম দেয়।
জিয়াউর রহমান ছিলেন স্বাধীনতা যুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার, পরে রাষ্ট্রপতি এবং বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর মৃত্যুর পর দলীয় ও রাষ্ট্রীয় রাজনীতিতে বড় শূন্যতা তৈরি হয়।
অল্প সময়ের মধ্যেই রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ে এবং ১৯৮২ সালে সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠা করে ক্ষমতায় আসেন এইচ এম এরশাদ।
৪৫ বছর পরও এই হত্যাকাণ্ড ঘিরে একাধিক প্রশ্ন অমীমাংসিত—
১৯৮১ সালের ৩০ মে শুধু একজন রাষ্ট্রপতির মৃত্যু নয়; এটি ছিল বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতা, সেনাবাহিনী ও রাজনৈতিক কাঠামোর গভীর সংকটের এক প্রতিচ্ছবি।
৪৫ বছর পরও সেই ভোর পুরোপুরি ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। ইতিহাসের পাতায় ঘটনাটি আছে, কিন্তু অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখনো অনুচ্চারিত। তাই জিয়া হত্যাকাণ্ড কেবল অতীত নয়—এটি এখনো বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি অসমাপ্ত অধ্যায়।