
দেশের সামনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জপূর্ণ সময় অপেক্ষা করছে উল্লেখ করে দলীয় নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে দায়িত্বহীনতা বা আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। সরকারকে সফল করতে এবং নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নে দলের সর্বস্তরের নেতা-কর্মীদের সক্রিয় সহযোগিতা প্রয়োজন। অন্যথায় এর ক্ষতি শুধু রাজনৈতিক দলের নয়, পুরো দেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর পড়বে।
রোববার বিকেলে রাজধানীর ফার্মগেটে অবস্থিত কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান–এর ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।
সভায় সভাপতিত্ব করেন বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
‘দেশের জন্যই কঠিন সময়’
বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, সামনে যে সময় আসছে, তা একই সঙ্গে কঠিন ও গুরুত্বপূর্ণ। এই সময় সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
তিনি বলেন, “আজ সকলের উদ্দেশে আমি বলব, আমাদের সামনে প্রথমত অত্যন্ত কঠিন সময় অপেক্ষা করছে। আমাদের সামনে একই সঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়ও অপেক্ষা করছে। এই গুরুত্বপূর্ণ ও কঠিন সময়ে আমরা যদি হেসেখেলে চলি, তাহলে বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যাবে।”
তিনি আরও বলেন, “ক্ষতি হয়তো ব্যক্তিগতভাবে কারও হবে না, কিন্তু ক্ষতি হবে দেশের, ক্ষতি হবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের।”
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণ যে নির্বাচনী ইশতেহারের পক্ষে রায় দিয়েছে, তার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ দিকেই শহীদ জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রচিন্তা ও উন্নয়ন দর্শনের প্রতিফলন রয়েছে। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকার কাজ করছে। তবে সরকারের একার পক্ষে সব কিছু সফল করা সম্ভব নয়।
তারেক রহমান বলেন, “সংসদে আমাদের ২১৪ জন সংসদ সদস্য আছেন, আমিসহ ৫০ জন মন্ত্রিসভার সদস্য রয়েছি। কিন্তু আমরা শুধু পরিশ্রম করলেই হবে না। সরকারের প্রতিটি ইতিবাচক ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম সফল করতে দলের নেতা-কর্মী, সমর্থক এবং সাধারণ মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন।”
ইশতেহার বাস্তবায়নে গুরুত্ব
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষা, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের যে পরিকল্পনা রয়েছে, তা মূলত শহীদ জিয়াউর রহমানের উন্নয়ন দর্শন থেকেই অনুপ্রাণিত।
তিনি বলেন, “শহীদ জিয়া যেভাবে শিক্ষার প্রসারে গুরুত্ব দিয়েছিলেন, জাতিকে শিক্ষিত করতে চেয়েছিলেন, আমাদের ইশতেহারেও সেই বিষয়গুলো প্রতিফলিত হয়েছে।”
শিল্পখাত নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প আজ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান উৎস। এই শিল্পের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল জিয়াউর রহমানের আমলে।
তিনি জানান, সরকার নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠা, বন্ধ কলকারখানা চালু, শিল্পখাতে বৈচিত্র্য আনা এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে অর্থনীতির ভিত্তি আরও শক্তিশালী করতে চায়।
“আমরা শুধু বিদ্যমান শিল্প নয়, ভবিষ্যতের সম্ভাবনাময় খাতগুলো নিয়েও কাজ করতে চাই। দেশে কী ধরনের নতুন শিল্প গড়ে তোলা যায়, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা আমাদের ইশতেহারে রয়েছে,” বলেন তিনি।
বাবার স্মৃতিচারণে আবেগঘন বক্তব্য
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতিচারণও করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তিনি ১৯৮৬ সালে মায়ের সঙ্গে ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরব সফরের একটি স্মৃতি তুলে ধরেন। বলেন, সে সময় মক্কার একটি হোটেলে এক বিদেশি মুসল্লির সঙ্গে তাঁর দেখা হয়েছিল। দেশ পরিচয় জানতে চাইলে তিনি বাংলাদেশ বলতেই ওই ব্যক্তি সঙ্গে সঙ্গে “জিয়াউর রহমান” নাম উচ্চারণ করেন।
তারেক রহমান বলেন, “আমি তখন উপলব্ধি করেছিলাম, মুসলিম বিশ্বের বহু মানুষ বাংলাদেশকে জিয়াউর রহমানের নামের মাধ্যমে চিনতেন। একজন সন্তান হিসেবে এটি আমার জন্য গর্বের বিষয় ছিল।”
তিনি আরও বলেন, স্বাধীনতার পর দুর্ভিক্ষের সময় বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন মর্যাদা অর্জন করে।
জিয়াউর রহমানের কর্ম ও দর্শন নিয়ে আলোচনা
অনুষ্ঠানে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের পাশাপাশি বিভিন্ন শিক্ষাবিদ ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা বক্তব্য দেন।
বক্তাদের মধ্যে ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সেলিমা রহমান, অধ্যাপক এ জেড এম জাহিদ হোসেন, বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক এবং বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতারা।
এ ছাড়া অর্থনীতিবিদ মাহবুব উল্লাহ, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন–এর চেয়ারম্যান মামুন আহমেদ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়–এর সহ-উপাচার্য মো. লুৎফর রহমান এবং বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়–এর সহ-উপাচার্য দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শন, রাষ্ট্রগঠন ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনা করেন।
দোয়া ও মোনাজাত
পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। পরে জিয়াউর রহমানের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়।
আলোচনা সভায় বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী, সমর্থক এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।