
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘কোচিং সেন্টার’ হিসেবে উল্লেখ করে দেওয়া বিতর্কিত বক্তব্য প্রত্যাহার করলেও আলোচনা-সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষাবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। পবিত্র ঈদুল আজহার দীর্ঘ ছুটিতে যখন দেশজুড়ে উৎসবের আবহ, তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে ঘিরে চলছে তীব্র বিতর্ক, সমালোচনা ও ট্রল। বক্তব্য প্রত্যাহারের পরও ক্ষোভের মাত্রা কমেনি; বরং নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে বিষয়টি।
সম্প্রতি একটি পডকাস্টে অংশ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে মন্তব্য করেন প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। সেখানে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টিকে ‘কোচিং সেন্টার’ হিসেবে উল্লেখ করেন বলে অভিযোগ ওঠে। বক্তব্যটি প্রকাশ্যে আসার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন মহলে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি।
ঢাবি ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা
বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজকে ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে। গত শুক্রবার সন্ধ্যায় ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) সংলগ্ন রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে আয়োজিত বিক্ষোভ ও মানববন্ধন কর্মসূচি থেকে এ ঘোষণা দেওয়া হয়।
কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা বলেন, নিজের নির্বাচনী এলাকা মোহাম্মদপুরে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি দেশের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য করেছেন। এ কারণেই তাকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছে।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা আরও অভিযোগ করেন, প্রতিমন্ত্রী বিভিন্ন সময় এমন বক্তব্য দিয়েছেন যা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে। তারা রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে স্লোগান দেন এবং প্রতীকী প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন। শেষে শিক্ষার্থীরা ঘোষণা দেন, ভবিষ্যতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রতিমন্ত্রীর কোনো ধরনের উপস্থিতি তারা মেনে নেবেন না।
শিক্ষকদের সংগঠন ‘সাদা দল’-এর নিন্দা
শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সংগঠন ‘সাদা দল’।
গত শুক্রবার সংগঠনের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মো. মোর্শেদ হাসান খান, যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম এবং অধ্যাপক ড. মো. আবুল কালাম সরকার স্বাক্ষরিত এক যৌথ বিবৃতিতে প্রতিমন্ত্রীর মন্তব্যকে ‘চরম অবমাননাকর ও দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বলে উল্লেখ করা হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, গবেষণা ও প্রকাশনায় দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শীর্ষস্থানীয় অবস্থানে রয়েছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন র্যাঙ্কিংয়েও বিশ্ববিদ্যালয়টি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃত।
সাদা দলের নেতারা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে প্রায় ৫৬টি বিশেষায়িত গবেষণা কেন্দ্র ও ব্যুরো রয়েছে। প্রতি বছর শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক মানের জার্নালে অসংখ্য গবেষণাপত্র প্রকাশ করছেন। এমন একটি প্রতিষ্ঠানের গবেষণা কার্যক্রম সম্পর্কে অসম্পূর্ণ ও ভুল তথ্যের ভিত্তিতে মন্তব্য করা অত্যন্ত দুঃখজনক।
তারা আরও বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; বরং বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, গণতান্ত্রিক আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন এবং সাম্প্রতিক ছাত্র-জনতার আন্দোলনসহ নানা ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
বিবৃতিতে বলা হয়, সীমিত বাজেট ও নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও শিক্ষা ও গবেষণায় বিশ্ববিদ্যালয়টির অবদান বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। তাই একজন দায়িত্বশীল প্রতিমন্ত্রীর মুখে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হলো কোচিং সেন্টার’ ধরনের মন্তব্য অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক এবং অজ্ঞতাপ্রসূত।
যেভাবে শুরু হয় বিতর্ক
ঘটনার সূত্রপাত গত সপ্তাহে একটি বেসরকারি টেলিভিশনের পডকাস্ট অনুষ্ঠানে। সেখানে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, উচ্চশিক্ষা ও তরুণদের কর্মসংস্থান নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ দেশের শিক্ষিত বেকারত্বের প্রসঙ্গ তোলেন। একপর্যায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে তার করা মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
ভিডিও ক্লিপটি ভাইরাল হওয়ার পর নেটিজেনদের একটি বড় অংশ তার বক্তব্যকে ‘উদ্ধত’ ও ‘অসৌজন্যমূলক’ বলে আখ্যা দেন। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, প্রাক্তন শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে শুরু করেন।
সমালোচনার মুখে বক্তব্য প্রত্যাহার
বিতর্ক তীব্র আকার ধারণ করলে দুই দিন পর নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে একটি দীর্ঘ পোস্ট দিয়ে বক্তব্য প্রত্যাহার করেন প্রতিমন্ত্রী।
‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনা ও বক্তব্যের ভুল উপস্থাপন প্রসঙ্গে’ শিরোনামের ওই পোস্টে তিনি বলেন, তার বক্তব্যের কিছু অংশ ভুলভাবে বোঝা হয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে ভুল ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, এটি ছিল একটি অনানুষ্ঠানিক ও স্বতঃস্ফূর্ত আলোচনার অংশ, কোনো গবেষণাভিত্তিক বা নীতিনির্ধারণী বক্তব্য নয়।
প্রতিমন্ত্রী লিখেছেন, তার উদ্দেশ্য কখনোই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য, মর্যাদা বা অবদানকে খাটো করা ছিল না। বরং তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টিকে আরও গবেষণানির্ভর ও আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলতে চেয়েছিলেন।
একই সঙ্গে তিনি দেশের উচ্চশিক্ষা খাতের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার সমালোচনা করেন। গবেষণায় পর্যাপ্ত গুরুত্ব না দেওয়া, শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন এবং চৌর্যবৃত্তির মতো অনৈতিক একাডেমিক চর্চার অভিযোগের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
পোস্টে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং জাতি গঠনে এর অবদানের প্রতি তার গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে। তারপরও তার বক্তব্যের কারণে কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে তিনি তা সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করছেন।
তিনি লেখেন, “আমার আংশিক বক্তব্যটি যেহেতু কিছুটা ভুল-বোঝাবুঝি সৃষ্টি করেছে এবং অনেকেই এতে অসন্তুষ্ট হয়েছেন, তাই আমি আমার বক্তব্য সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করে নিচ্ছি এবং আশা করি এরপর এ বিষয়ে আর কোনো বিতর্ক ও ভুল-বোঝাবুঝি থাকবে না।”
ঈদের ছুটিতে সামাজিক মাধ্যমে নতুন করে বিতর্ক
বক্তব্য প্রত্যাহারের পর বিষয়টি থেমে যাবে বলে ধারণা করা হলেও ঈদের ছুটিতে তা নতুন মাত্রা পায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের একটি বড় অংশ আবারও বিষয়টি সামনে নিয়ে আসেন।
ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপ ও ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য নিয়ে অসংখ্য পোস্ট, মিম ও ব্যঙ্গাত্মক কনটেন্ট ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন ট্রল পেজ তার দুঃখ প্রকাশের পোস্টকেও ব্যঙ্গাত্মকভাবে উপস্থাপন করে।
মাইক্রোব্লগিং প্ল্যাটফর্ম এক্সে হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে কেউ কেউ তার পদত্যাগের দাবিও তোলেন। অন্যদিকে টিকটকে তার বক্তব্যের অডিও ব্যবহার করে তৈরি শত শত ভিডিও লাখো ভিউ অর্জন করে।
বিভক্ত জনমত
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিষয়টি নিয়ে জনমত বিভক্ত।
সমালোচকদের মতে, একজন দায়িত্বশীল প্রতিমন্ত্রীর কাছ থেকে এমন মন্তব্য প্রত্যাশিত নয়। তাদের ভাষ্য, বক্তব্য প্রত্যাহার করলেই বিতর্কের অবসান ঘটে না, বিশেষ করে যখন দেশের তরুণরা কর্মসংস্থান সংকট ও উচ্চশিক্ষার নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
অন্যদিকে প্রতিমন্ত্রীর সমর্থকদের দাবি, বিষয়টিকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তাদের মতে, তিনি ভুল বোঝাবুঝির জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন এবং বক্তব্য প্রত্যাহারও করেছেন। এরপরও বিষয়টিকে টেনে এনে বিতর্ক জিইয়ে রাখা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ
রাজনৈতিক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিশ্লেষকদের মতে, ডিজিটাল যুগে জননেতা ও নীতিনির্ধারকদের প্রতিটি বক্তব্য মুহূর্তের মধ্যে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। ফলে বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি সতর্কতা প্রয়োজন।
তাদের মতে, কোনো বক্তব্য জনমনে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করলে পরবর্তী সময়ে ব্যাখ্যা দেওয়া বা বক্তব্য প্রত্যাহার করলেও সেই ক্ষোভ পুরোপুরি প্রশমিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। ববি হাজ্জাজকে ঘিরে ঈদের ছুটিতে সামাজিক মাধ্যমে চলমান বিতর্ক সেই বাস্তবতাকেই নতুন করে সামনে এনেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই বিতর্ক আপাতত থামার কোনো লক্ষণ নেই। বক্তব্য প্রত্যাহারের পরও শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের একাংশের অসন্তোষ বহাল রয়েছে। ফলে বিষয়টি রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে আরও কিছুদিন আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।