
কয়েক দশকের কঠোর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, বিক্ষোভ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার পর ২০১৮ সালে ইথিওপিয়ার ক্ষমতায় এসে নতুন শুরুর আশা জাগিয়েছিলেন আবি আহমেদ। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে প্রতিবেশী ইরিত্রিয়ার সঙ্গে দুই দশকের শত্রুতা অবসান ঘটিয়ে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত হন এবং পরে নোবেল শান্তি পুরস্কার অর্জন করেন।
তবে সেই আশাবাদের চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে। আসন্ন নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে দেশটি আজ গভীর রাজনৈতিক বিভাজন, জাতিগত সংঘাত এবং প্রশ্নবিদ্ধ শাসনব্যবস্থার মুখোমুখি।
সিএনএন-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, একসময় যিনি ইথিওপিয়াকে গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে নেওয়ার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত ছিলেন, তিনি এখন সমালোচকদের কাছে দেশের বিভেদের অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্রে পরিণত হয়েছেন।
সংস্কারের প্রতিশ্রুতি থেকে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ
আবি আহমেদের ক্ষমতায় আসা ছিল ইথিওপিয়ার দীর্ঘদিনের বিক্ষোভ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার পরিণতি। তার পূর্বসূরি হাইলেমারিয়াম দেসালেন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও কঠোর দমননীতির জন্য সমালোচিত হয়ে পদত্যাগে বাধ্য হন।
ক্ষমতায় এসে আবি দ্রুত সংস্কারের পথে হাঁটেন। রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি, সংবাদমাধ্যমে তুলনামূলক স্বাধীনতা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে ইরিত্রিয়ার সঙ্গে শান্তিচুক্তি—সবকিছুই তাকে আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে।
এই পদক্ষেপের জন্যই তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার পান, যা তাকে একটি সম্ভাব্য “গণতান্ত্রিক রূপান্তরের স্থপতি” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।
নোবেলের পর রাজনৈতিক বাস্তবতার পরিবর্তন
কিন্তু ২০১৯ সালের পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। আবি নেতৃত্বাধীন সরকার পুরোনো জোট ইপিআরডিএফ বিলুপ্ত করে নতুন রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলে—প্রসপারিটি পার্টি।
একই সঙ্গে আঞ্চলিক বাহিনী বিলুপ্ত করে কেন্দ্রীয় সেনাবাহিনীর অধীনে আনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এই পদক্ষেপ তিগ্রাইসহ বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্র বিরোধ সৃষ্টি করে।
বিশেষ করে তিগ্রাই পিপলস লিবারেশন ফ্রন্ট ক্ষমতা হারানোর পর সরাসরি বিরোধিতায় নামে, যা পরবর্তীতে সংঘাতের পথ তৈরি করে।
গৃহযুদ্ধ ও মানবিক বিপর্যয়
২০২০ সালে কেন্দ্র ও তিগ্রাইয়ের মধ্যে সংঘাত পূর্ণমাত্রার গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই যুদ্ধ সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাণঘাতী সংঘাতগুলোর একটি।
২০২২ সালে আফ্রিকান ইউনিয়নের মধ্যস্থতায় শান্তিচুক্তি হলেও সেটি স্থায়ী হয়নি। পরবর্তীতে আমহারা ও ওরোমিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলেও নতুন করে সশস্ত্র সংঘাত শুরু হয়।
লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হন এবং দেশের বড় অংশে মানবিক সংকট দেখা দেয়।
“দুই ইথিওপিয়া”—উন্নয়ন বনাম যুদ্ধ
রাজধানী আদ্দিস আবাবায় নতুন অবকাঠামো, উন্নয়ন প্রকল্প এবং অর্থনৈতিক আধুনিকায়নের চিত্র দেখা গেলেও দেশের বড় অংশে যুদ্ধ, নিরাপত্তাহীনতা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বৈপরীত্য ইথিওপিয়ার বর্তমান বাস্তবতাকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছে—একদিকে উন্নয়নশীল রাজধানী, অন্যদিকে সংঘাত-ক্ষতবিক্ষত অঞ্চল।
নির্বাসিত রাজনৈতিক গবেষক সুরাফেল গেতাহুন বলেন, বর্তমান শাসনামলে ইথিওপীয় সমাজ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি বিভক্ত হয়ে পড়েছে এবং সামাজিক আস্থা ভেঙে গেছে।
বিরোধীদের অভিযোগ ও দমননীতি
বিভিন্ন বিরোধী দল ও মানবাধিকার সংগঠনের অভিযোগ, রাজনৈতিক হয়রানি, গ্রেপ্তার এবং মতপ্রকাশে বাধা নির্বাচনী পরিবেশকে প্রভাবিত করছে।
বিরোধী নেতা ইয়োব মেসাফিন্ট অভিযোগ করেন, তাদের কর্মীদের গ্রেপ্তার ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে, বিশেষ করে যেসব এলাকায় বিরোধী সমর্থন বেশি, সেখানে পরিস্থিতি আরও কঠিন।
অন্যদিকে সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করছে, তারা একটি স্থিতিশীল ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজনের চেষ্টা করছে।
নির্বাচন ঘিরে অনিশ্চয়তা
আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—এটি কতটা গ্রহণযোগ্য হবে। চলমান সংঘাতের কারণে দেশের কিছু অঞ্চলে ভোটগ্রহণ সম্ভব হচ্ছে না।
বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতাসীন দলের কৌশলগতভাবে সীমিত আসনে প্রার্থী দেওয়া এবং বিরোধীদের বিভক্ত অবস্থা নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে দুর্বল করেছে।
অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, এই নির্বাচন কার্যত ক্ষমতার পুনঃনিশ্চিতকরণ ছাড়া আর কিছু নয়, যেখানে ফলাফল প্রায় পূর্বনির্ধারিত বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
এক অসমাপ্ত রূপান্তরের গল্প
একসময় যিনি আফ্রিকার গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত ছিলেন, সেই আবি আহমেদের রাজনৈতিক যাত্রা এখন এক জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি।
নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্ত একজন নেতা থেকে গৃহযুদ্ধ, জাতিগত বিভাজন ও রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়া—ইথিওপিয়ার বর্তমান পরিস্থিতিকে বিশ্বরাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ ও উদ্বেগজনক অধ্যায়ে পরিণত করেছে।