প্রিন্ট এর তারিখঃ Jun 2, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ Jun 2, 2026 ইং
আদ-দ্বীন হাসপাতালে ৬ নবজাতকের মৃত্যু: বদ্ধ কক্ষে অক্সিজেন সংকটের প্রাথমিক প্রমাণ

রাজধানীর মগবাজার আদ-দ্বীন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে একই রাতে ছয় নবজাতকের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনাটির প্রকৃত কারণ উদঘাটনে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গঠিত উচ্চপর্যায়ের তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি তাদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ জানিয়েছে। তদন্তকারীদের মতে, হাসপাতালের পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (এসি) দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকা এবং ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত মানুষের উপস্থিতির কারণে কক্ষে অক্সিজেনের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে কমে কার্বন ডাই-অক্সাইড বৃদ্ধি পায়। মূলত এই তীব্র অক্সিজেন সংকটের কারণেই পরপর ছয়টি নবজাতক মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
হৃদয়বিদারক এই ঘটনার তদন্তের অগ্রগতি, আইনি পদক্ষেপ এবং হাসপাতালের অবকাঠামোগত ত্রুটির বিস্তারিত বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:
ঘটনার নেপথ্যে: ২ ঘণ্টার অবহেলা ও পরিবেশগত বিপর্যয়
তদন্ত কমিটির সরেজমিন পরিদর্শনে জানা গেছে, গত ২৭ মে রাতে সিজারিয়ান অপারেশনের পর পাঁচজন প্রসূতি মায়ের ছয়টি নবজাতককে (যার মধ্যে একটি যমজ সন্তান ছিল) হাসপাতালের পোস্ট-অপারেটিভ কক্ষে রাখা হয়েছিল। গভীর রাতে কক্ষের ভেতর থাকা একজন নারী দর্শনার্থী শীত লাগার অজুহাতে কর্তব্যরত নার্সকে তীব্রভাবে এসি বন্ধ করার অনুরোধ জানান। নার্স কক্ষের এসি বন্ধ করে দিলেও ওই বিশেষ ওয়ার্ডটিতে বাইরে থেকে প্রাকৃতিক বাতাস আসা-যাওয়ার কোনো বিকল্প ভেন্টিলেশন বা ব্যবস্থা ছিল না।
এর ওপর, নবজাতকদের মায়েদের পাশাপাশি প্রায় অর্ধশতাধিক বহিরাগত দর্শনার্থী ও স্বজন ওই ছোট কক্ষে গাদাগাদি করে অবস্থান করছিলেন। ফলে দীর্ঘ দুই ঘণ্টারও বেশি সময় এসি বন্ধ থাকায় কক্ষের ভেতরের অক্সিজেন দ্রুত ফুরিয়ে যায় এবং কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ মারাত্মকভাবে বেড়ে যায়। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাহীন নবজাতকগুলো এই বিষাক্ত ও বাতাসহীন পরিবেশে দ্রুত অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং অক্সিজেনের অভাবে মারা যায়। তদন্ত কমিটির একজন সদস্য একে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের চরম অব্যবস্থাপনা ও অবহেলা হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কঠোর অবস্থান ও কারিগরি দল গঠন
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুলের নির্দেশে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মো. মোহসিনের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। এই কমিটিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাসের সার্বিক তত্ত্বাবধানে একজন পরিচালক ও প্রখ্যাত নিউনেটাল বিশেষজ্ঞ যুক্ত আছেন। এছাড়া হাসপাতালের ভবন নির্মাণ ও অভ্যন্তরীণ মেকানিক্যাল ত্রুটি খতিয়ে দেখতে পরবর্তীতে কমিটিতে গণপূর্ত ও মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দুজন বিশেষজ্ঞকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন, “তদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পাওয়ার পর দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের অবহেলা বা অবকাঠামোগত ত্রুটি প্রমাণিত হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোরতম আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
থানা পুলিশ ও সিআইডির ফরেনসিক তদন্ত
মর্মান্তিক এই মৃত্যুর ঘটনায় ইতিমধ্যেই রাজধানীর রমনা থানায় একটি ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়েছে। রমনা থানা পুলিশ জানিয়েছে, তদন্তে যার অবহেলাই প্রমাণিত হোক না কেন, তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। এদিকে অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) মিডিয়া শাখার বিশেষ পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন সরকার জানিয়েছেন, সিআইডির একটি বিশেষজ্ঞ ক্রাইম সিন দল আদ-দ্বীন হাসপাতালের ওই নির্দিষ্ট পোস্ট-অপারেটিভ কক্ষটি পরিদর্শন করেছে। সেখান থেকে বাতাস ও পরিবেশের বিভিন্ন রাসায়নিক নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে, যার ফরেনসিক রিপোর্ট মামলার তদন্তে বড় ভূমিকা রাখবে।
হাসপাতালের ঐতিহ্য ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
মগবাজারের এই আদ্-দ্বীন হাসপাতালটি মূলত স্বল্পমূল্যে অ্যাম্বুলেন্স সেবা, সাশ্রয়ী খরচে সিজারিয়ান অপারেশন এবং দরিদ্র রোগীদের বিনামূল্যে উন্নত চিকিৎসা প্রদানের জন্য দীর্ঘদিন ধরে সুনাম অর্জন করে আসছিল। ঘটনার পরও হাসপাতালটিতে সাধারণ রোগীদের ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। তবে তদন্তকারী দলের মতে, বিপুল সংখ্যক রোগীর চাপ সামলানোর জন্য হাসপাতালটির বর্তমান অবকাঠামো ও জরুরি ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত অপর্যাপ্ত।
হাসপাতালের পরিচালক তারিকুল ইসলাম মুকুল এই ঘটনায় গভীর দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, “১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে হাসপাতালটি সুনামের সাথে সব শ্রেণীর মানুষের সেবা দিয়ে আসছে। ২৭ মে রাতের এই ঘটনা আমাদের গভীরভাবে মর্মাহত করেছে। আমরা নিজেরাও একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি গঠন করেছি।” একই সাথে এটি কোনো সুদূরপ্রসারী নাশকতা বা ষড়যন্ত্রের অংশ কি না, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সেই বিষয়টিও খতিয়ে দেখছে বলে তিনি জানান।
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ বার্তা এক্সপ্রেস