
অগ্ন্যাশয় ক্যানসারের মতো জটিল ও প্রাণঘাতী রোগের চিকিৎসায় নতুন এক ওষুধকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। দৈনিক মুখে খাওয়ার এই ওষুধ রোগীদের বেঁচে থাকার সময় প্রায় দ্বিগুণ করতে পারে বলে আন্তর্জাতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে।
ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান–এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত ক্যানসারবিষয়ক একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এই গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি কয়েক দশকের মধ্যে অগ্ন্যাশয় ক্যানসার চিকিৎসায় সবচেয়ে বড় অগ্রগতিগুলোর একটি।
শিকাগোতে অনুষ্ঠিত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ক্যানসার সম্মেলন American Society of Clinical Oncology Annual Meeting–এ গবেষণাটি তুলে ধরা হয়। সেখানে জানানো হয়, উন্নত পর্যায়ের অগ্ন্যাশয় ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের ওপর পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহৃত নতুন ওষুধ ডারাক্সোনরাসিব উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে।
গবেষণায় অংশ নেওয়া প্রায় ৫০০ রোগীর মধ্যে যাঁরা এই ওষুধ গ্রহণ করেছেন, তাঁদের গড় বেঁচে থাকার সময় ছিল প্রায় ১৩ মাস ২ দিন। অন্যদিকে প্রচলিত কেমোথেরাপি গ্রহণকারী রোগীদের ক্ষেত্রে এই সময় ছিল প্রায় ৬ মাস ৬–৭ দিন।
ডারাক্সোনরাসিব নামের এই ওষুধটি ক্যানসার কোষ বৃদ্ধির জন্য দায়ী একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিন ‘KRAS’–কে নিষ্ক্রিয় করে কাজ করে। চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা জানান, এই প্রোটিন অগ্ন্যাশয় ক্যানসারের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সক্রিয় থাকে এবং ক্যানসার দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার জন্য দায়ী।
বিশেষজ্ঞদের মতে, KRAS জিনের মিউটেশন প্যানক্রিয়াটিক ডাক্টাল অ্যাডেনোকারসিনোমা নামের সবচেয়ে সাধারণ অগ্ন্যাশয় ক্যানসারের প্রায় ৯০ শতাংশ রোগীর মধ্যেই পাওয়া যায়। ফলে এই লক্ষ্যভিত্তিক চিকিৎসা পদ্ধতি চিকিৎসাক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, শুধু জীবনকাল বৃদ্ধি নয়, প্রচলিত কেমোথেরাপির তুলনায় এই ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও তুলনামূলকভাবে কম। ফলে রোগীরা চিকিৎসা চলাকালীন সময় তুলনামূলকভাবে ভালো শারীরিক অবস্থায় থাকতে পারছেন।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্যানক্রিয়াটিক ক্যানসার অ্যাকশন সংস্থার প্রধান নির্বাহী পলা হ্যানফোর্ড এই অগ্রগতিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর মতে, দীর্ঘদিন ধরে অগ্ন্যাশয় ক্যানসারের চিকিৎসায় সীমিত সুযোগ ছিল এবং বেঁচে থাকার হারও অত্যন্ত কম ছিল। নতুন ওষুধটি সেই বাস্তবতায় বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
একই সংস্থার গবেষণা ও উদ্ভাবন বিভাগের পরিচালক অ্যানা জুয়েল বলেন, এই ওষুধ রোগীদের জীবনকাল শুধু বাড়াচ্ছে না, বরং তাঁদের পরিবারকে আরও কয়েক মাস একসঙ্গে থাকার সুযোগ দিচ্ছে—যা চিকিৎসার মানবিক দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন এই নতুন চিকিৎসা সাধারণ রোগীদের জন্য সহজলভ্য করা।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, KRAS জিন শুধু অগ্ন্যাশয় ক্যানসার নয়, ফুসফুস ও কোলন ক্যানসারসহ আরও অনেক ক্যানসারের বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখে। ফলে এই গবেষণার সাফল্য ভবিষ্যতে অন্যান্য ক্যানসারের চিকিৎসায়ও নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।
বর্তমানে ফুসফুস ও কোলন ক্যানসারের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ওষুধের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চলছে বলে জানা গেছে। চিকিৎসাবিদদের আশা, এসব গবেষণা সফল হলে ক্যানসার চিকিৎসায় একটি নতুন যুগের সূচনা হতে পারে।