
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী বন্ধকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে এ বিষয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন মামুনুল হক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক দীর্ঘ স্ট্যাটাসে তিনি আলেম সমাজের প্রতিবাদের ধরন, ধর্মীয় অনুভূতি এবং চলমান বিতর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে মন্তব্য করেছেন।
মঙ্গলবার (৩ জুন) রাত পৌনে ৯টার দিকে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ‘প্রসঙ্গ বনলতা এক্সপ্রেস ও আলেম সমাজের ক্ষোভ!’ শিরোনামে স্ট্যাটাসটি প্রকাশ করেন তিনি। বর্তমানে সৌদি আরবের Mecca নগরীতে অবস্থানরত বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের এই আমির সেখানে চলমান বিতর্ক নিয়ে ব্যাখ্যামূলক বক্তব্য দেন।
ধর্মীয় কার্যক্রমের দুটি ধারা তুলে ধরেন মামুনুল হক
স্ট্যাটাসের শুরুতে মামুনুল হক আলেম সমাজের ধর্মীয় কার্যক্রমকে দুটি প্রধান ভাগে বিভক্ত করে ব্যাখ্যা করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এক ধরনের কার্যক্রম পরিচালিত হয় মানুষকে উদ্বুদ্ধ, শিক্ষিত ও সচেতন করার মাধ্যমে। অন্য ধরনের কার্যক্রম পরিচালিত হয় প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের মাধ্যমে।
তিনি বলেন, ইসলামের শিক্ষা, আত্মশুদ্ধি এবং দাওয়াহ বা ধর্মীয় প্রচারের মতো কাজগুলো সাধারণত মানুষকে বুঝিয়ে, পরামর্শ দিয়ে এবং উদ্বুদ্ধ করার মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এসব ক্ষেত্রে হিকমাহ (উত্তম কর্মকৌশল) ও নসিহাহ (কল্যাণকামী উপদেশ) সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
অন্যদিকে সমাজে সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজ প্রতিরোধ করাও ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বলে উল্লেখ করেন তিনি। তবে এ ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে ‘সামর্থ্য’ বা সক্ষমতাকে প্রধান শর্ত হিসেবে তুলে ধরেন।
রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও সক্ষমতার প্রশ্ন
মামুনুল হক তাঁর বক্তব্যে বলেন, অন্যায় প্রতিরোধের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক ক্ষমতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সক্ষমতা। তাঁর মতে, ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জনের পর সৎ কাজের নির্দেশ ও অসৎ কাজের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা শাসকদের অন্যতম দায়িত্ব।
তবে বাংলাদেশে শরিয়াহভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় বিভিন্ন ধরনের বিষয়ে প্রতিবাদের সক্ষমতা সমান নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের মাত্রা বেশি হতে পারে, আবার কোনো ক্ষেত্রে তা সীমিত হতে পারে।
তিনি উদাহরণ হিসেবে বলেন, আল্লাহ ও মহানবী (সা.)-কে নিয়ে কটূক্তি, পবিত্র কোরআনের বিধান নিয়ে বিদ্রূপ কিংবা ইসলামি মূল্যবোধের অবমাননার মতো বিষয়গুলো এক ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। অন্যদিকে ধর্মীয় সংস্কৃতি, আলেম-ওলামা কিংবা সামাজিক ঐতিহ্যের অবমাননা বা অশ্লীলতার মতো বিষয়গুলো ভিন্ন মাত্রার প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়।
‘বনলতা এক্সপ্রেস’ ইস্যুতে অভিযোগের তদন্ত চাইলেন
চলমান বিতর্ক প্রসঙ্গে মামুনুল হক বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ চলচ্চিত্রকে ঘিরে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, সেটি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ধর্মপ্রাণ মানুষের আবেগ ও অনুভূতিতে আঘাত হানতে পারে—এমন কোনো ঘটনা সত্যিই ঘটেছে কি না, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা ও অনুসন্ধান প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন অভিযোগ সামনে এসেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
মামুনুল হকের দাবি, আলোচনায় পবিত্র বাইতুল্লাহ শরিফের অবমাননা এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সর্বজনশ্রদ্ধেয় আলেম তাজুল ইসলাম-এর সম্মানহানির মতো গুরুতর অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। এসব অভিযোগ সত্য হলে বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি রাখে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বিশেষ করে পবিত্র বাইতুল্লাহ শরিফের অবমাননার অভিযোগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এমন কোনো ঘটনা ঘটে থাকলে তা অত্যন্ত গুরুতর বিষয় হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।
‘ধূম্রজাল’ দূর করে সত্যতা স্পষ্ট করার আহ্বান
স্ট্যাটাসের শেষাংশে মামুনুল হক বলেন, যদি ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ ও সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের ক্ষোভের মূল কারণ সত্যিই উত্থাপিত অভিযোগগুলো হয়ে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্টদের উচিত দ্রুত বিষয়টি আমলে নিয়ে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া।
অন্যদিকে যদি শুধুমাত্র একটি চলচ্চিত্রের প্রদর্শনীকে কেন্দ্র করেই প্রতিবাদ হয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি ভিন্নভাবে মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তাঁর ভাষায়, পুরো ঘটনাকে ঘিরে একটি ‘ধূম্রজাল’ বা বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তাই প্রকৃত ঘটনা কী, অভিযোগগুলোর ভিত্তি কতটুকু এবং প্রতিবাদের কারণ কী—এসব বিষয় জনসম্মুখে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
একই সঙ্গে তিনি বলেন, আলেম সমাজ ও ইসলামপন্থী জনতার প্রতিবাদী ভূমিকা সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য ও বোধগম্য হওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের উচিত ঘটনার প্রকৃত তথ্য তুলে ধরা এবং বিভ্রান্তি দূর করা।
উল্লেখ্য, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী বন্ধ হওয়া এবং তা ঘিরে বিভিন্ন মহলের প্রতিক্রিয়া সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও জনপরিসরে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে। এ পরিস্থিতিতে মামুনুল হকের এই বক্তব্য নতুন করে বিতর্কটির বিভিন্ন দিক সামনে নিয়ে এসেছে।