
বিদ্যুৎ খাতের অনিয়ম, দুর্নীতি ও ‘সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রিত লুটপাট’ বন্ধ না করে বরং বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
তিনি বলেন, সরকারের উচিত ছিল বিদ্যুৎ খাতে সিস্টেম লস, ক্যাপাসিটি চার্জসহ বিভিন্ন খাতে কথিত অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ করা। কিন্তু তা না করে উল্টো জনগণের ওপর মূল্যবৃদ্ধির বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ–এর উত্তর গেটে দফায় দফায় জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে আয়োজিত বিক্ষোভ মিছিলপূর্ব সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন। এই কর্মসূচির আয়োজন করে জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগরী উত্তর ও দক্ষিণ শাখা।
‘দুর্নীতির দায় জনগণের ওপর চাপানো হয়েছে’
গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেন, বিদ্যুৎ খাতের সব অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে সরকারের একটি সিন্ডিকেট জড়িত। তিনি বলেন, জনগণের স্বার্থ না দেখে একটি স্বার্থান্বেষী মহল বিদ্যুৎ খাতকে নিয়ন্ত্রণ করছে।
তিনি আরও বলেন, বিদ্যুৎমন্ত্রী পূর্বে ঘোষণা দিয়েছিলেন আগামী দুই বছর বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হবে না। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে তিন মাসের মধ্যেই দাম বৃদ্ধি করা হয়েছে।
তার ভাষায়, “দুই বছরের মধ্যে দাম না বাড়ানোর কথা বলেছিলেন, কিন্তু তিন মাসের মধ্যেই দাম বাড়ানো হলো। আগামী দিনে জনগণের রক্ত চুষে নেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।”
আন্তর্জাতিক সংস্থার শর্ত নিয়ে সমালোচনা
সমাবেশে জামায়াত নেতা আরও দাবি করেন, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)–এর কারিগরি কমিটির সুপারিশের চেয়েও বেশি হারে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের শর্তের কথা বলে সরকার জনগণের ওপর বাড়তি ব্যয় চাপিয়ে দিচ্ছে।
তার অভিযোগ, “আমরা কোনো দাসখত দিইনি, আমরা তাদের গোলাম না। তাদের শর্ত মেনে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো জনগণের জন্য দুর্ভোগ বাড়িয়েছে।”
এ সময় তিনি সরকারের আর্থিক ও জ্বালানি নীতির তীব্র সমালোচনা করেন।
ব্যাংকিং খাত নিয়েও অভিযোগ
সমাবেশে ইসলামী ব্যাংক সংক্রান্ত প্রসঙ্গ টেনে গোলাম পরওয়ার বলেন, অতীতে এস আলম গ্রুপ ব্যাংকটি লুটপাট করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে সরকারও সেই ব্যাংকের ওপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অনিয়মে জড়িত হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।
তার মতে, অর্থনৈতিক খাতে সুশাসনের অভাবের কারণে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং সরকার জনগণের সমস্যার পরিবর্তে স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বেশি মনোযোগী।
সরকারের জনপ্রিয়তা নিয়ে মন্তব্য
সরকারের কার্যক্রম নিয়ে সমালোচনা করে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে জনগণের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে।
তিনি বলেন, “তিন মাসের মধ্যেই জনগণ ‘ভুয়া ভুয়া’ বলে প্রতিক্রিয়া দিচ্ছে। সামনে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে।”
সমাবেশ ও মিছিল
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন নূরুল ইসলাম বুলবুল এবং সঞ্চালনা করেন শফিকুল ইসলাম মাসুদ।
এ ছাড়া বক্তব্য দেন রফিকুল ইসলাম খান, সেলিম উদ্দিন, মোবারক হোসাইন, হেলাল উদ্দিন এবং ইয়াসিন আরাফাত।
সমাবেশ শেষে বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেট থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি পুরানা পল্টন মোড়, বিজয়নগর ও কাকরাইল হয়ে শান্তিনগর এলাকায় গিয়ে শেষ হয়।
রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের মূল্যবৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে চলমান রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যে এ ধরনের সমাবেশ ও বিক্ষোভ কর্মসূচি নতুন করে উত্তাপ সৃষ্টি করেছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর দাবি, অর্থনৈতিক চাপ ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষ চাপে রয়েছে। অন্যদিকে সরকার বলছে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও জ্বালানি খাতের বাস্তবতা বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
এ অবস্থায় বিদ্যুৎ খাতের মূল্যনীতি ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা আরও জোরদার হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।