
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় সংগঠনিক দুর্বলতা ও অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়–এর দল তৃণমূল কংগ্রেস এখন নতুন করে রাজনৈতিক চাপে পড়েছে। বিধানসভায় কথিত ‘ফাটল’-এর পর এবার ভারতের জাতীয় সংসদে দলটির অবস্থান দুর্বল করার দিকে নজর দিয়েছে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)।
দলীয় ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিজেপির লক্ষ্য এখন শুধু সরকার পরিচালনা নয়; বরং সংসদের উভয় কক্ষে এমন শক্ত অবস্থান তৈরি করা, যাতে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক সংশোধনী বিল পাসে আর কোনো বড় বাধা না থাকে।
সংসদে সংখ্যার হিসাব ও বিজেপির কৌশল
বর্তমানে লোকসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের আসন সংখ্যা ২৮ এবং রাজ্যসভায় ১৩। অন্যদিকে বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটের জন্য দুই–তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে লোকসভায় অন্তত ৩৬২ জন সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই লক্ষ্য অর্জন করতে বিজেপি এখন বিরোধী শিবিরের ভেতরে সম্ভাব্য ভাঙন ও সমর্থন পুনর্বিন্যাসের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল ও দক্ষিণ ভারতের শক্তিশালী দল ডিএমকে’র দিকেও নজর রাখা হচ্ছে।
দ্রাবিড় মুন্নেত্র কড়গম (ডিএমকে)-এর লোকসভায় ২২ জন সদস্য রয়েছে, যা সংসদের শক্তির ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ বিল ও রাজনৈতিক সমীকরণ
সংবিধান সংশোধনের জন্য প্রয়োজনীয় দুই–তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন না হওয়ায় বিজেপি আগের গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ—যেমন ‘মহিলা সংরক্ষণ বিল’—পাস করাতে হিমশিম খেয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে।
এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বিজেপি এখন ভবিষ্যৎ বিলগুলোর জন্য আগাম রাজনৈতিক ভিত্তি শক্ত করার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে ‘এক দেশ এক ভোট’ ও পুনর্গঠিত নারী আসন সংরক্ষণ বিলকে সামনে রেখে সংসদীয় সমর্থন বাড়ানোর কৌশল নেওয়া হচ্ছে।
তৃণমূল ও ডিএমকে–কে ঘিরে কৌশল
রাজনৈতিক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, তৃণমূল ও ডিএমকে–তে ভাঙন বা অবস্থান পরিবর্তন ঘটানো গেলে বিজেপির জন্য প্রয়োজনীয় সমর্থনের ঘাটতি অনেকটাই কমে যাবে।
এ কারণে শুধু দল ভাঙানোর রাজনীতি নয়, বরং সংসদীয় স্তরে ‘অনুকূল অবস্থান’ তৈরি করার দিকেও বিজেপি মনোযোগ দিচ্ছে। এতে সরাসরি দলত্যাগ না করেও বিরোধী সাংসদদের সরকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।
“অনুগত বিরোধী” কাঠামোর সম্ভাবনা
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ মনে করছেন, বিরোধী দলগুলোর একটি অংশ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নীরব সমর্থন দিতে পারে—যাকে অনেকে “অনুগত বিরোধী” হিসেবে বর্ণনা করছেন।
এই প্রেক্ষাপটে অতীতে বিভিন্ন রাজ্যের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার তুলনাও টানা হচ্ছে, যেখানে বিরোধী অবস্থানে থেকেও কার্যত সরকারি নীতির পক্ষে অবস্থান নেওয়ার নজির রয়েছে।
ইন্ডিয়া জোটের ওপর সম্ভাব্য চাপ
ইন্ডিয়া জোট–এর অভ্যন্তরীণ সমন্বয় নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। তৃণমূল ও ডিএমকে যদি সংসদীয় কৌশলে বিভক্ত অবস্থান নেয়, তবে বিরোধী জোটের ঐক্য আরও দুর্বল হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তবে এখনো পর্যন্ত কংগ্রেসসহ জোটের মূল অংশীদাররা দলীয় ভাঙন উৎসাহিত করার বিষয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা
তৃণমূলের ভেতরে সংসদীয় রাজনীতিতে নেতৃত্ব ও কৌশল নিয়ে কিছু মতপার্থক্যের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। বিভিন্ন সংসদ সদস্যের মধ্যে অসন্তোষ ও যোগাযোগের গুঞ্জন থাকলেও এখনো তা সংগঠিত ভাঙনে রূপ নেয়নি।
অন্যদিকে বিজেপি শিবির এই পরিস্থিতিকে তাদের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কাজে লাগাতে চাইছে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে।
সামগ্রিক চিত্র
বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণে কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে শক্তি ভারসাম্য পুনর্গঠনের চেষ্টা স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। একদিকে বিজেপি সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা আরও সুসংহত করার কৌশল নিচ্ছে, অন্যদিকে বিরোধী শিবির নিজেদের ঐক্য ধরে রাখার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।
সব মিলিয়ে ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে আসন্ন সময়টি আরও তীব্র কৌশলগত প্রতিযোগিতার ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।