
বাংলা চলচ্চিত্রে দীর্ঘদিন ধরে অ্যাকশনধর্মী চরিত্রে দর্শকদের মন জয় করেছেন শাকিব খান। তবে এবারের ঈদে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘রকস্টার’ সিনেমায় তিনি হাজির হয়েছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক রূপে। বন্দুকের পরিবর্তে হাতে গিটার, আর মারামারির বদলে গান ও আবেগ—এই পরিবর্তনই সিনেমাটির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।
নতুন পরিচালক আজমান রুশোর নির্মাণে ‘রকস্টার’ মূলত একজন সংগীতশিল্পীর জীবন, সংগ্রাম, প্রেম এবং খ্যাতির অন্ধকার দিকের গল্প তুলে ধরেছে। ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র আগুন, যিনি সংগীতপ্রেমী একটি পরিবারের সন্তান। তাঁর বাবা একজন প্রতিষ্ঠিত শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পী হলেও আগুন নিজের পথ আলাদা করে নিতে চায়। তাই সে বেছে নেয় রক সংগীতের জগৎ।
শৈশবের কিছু মানসিক আঘাত এবং ভাঙা পারিবারিক পরিবেশ আগুনের ব্যক্তিত্বে গভীর প্রভাব ফেলে। একটি ব্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও দীর্ঘদিন মঞ্চভীতির কারণে সামনে আসতে পারেন না তিনি। কিন্তু এক বিশেষ মুহূর্তে দর্শকদের সামনে গান গেয়ে রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।
খ্যাতির সঙ্গে সঙ্গে তাঁর জীবনে আসে প্রেম। মীরা নামের এক তরুণীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যা গল্পের আবেগী অংশকে এগিয়ে নিয়ে যায়। তবে সাফল্যের পাশাপাশি নেশা, মানসিক সংকট ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের জটিলতা আগুনের জীবনকে কঠিন পথে ঠেলে দেয়।
ছবিটির সবচেয়ে শক্তিশালী দিক নিঃসন্দেহে শাকিব খানের উপস্থিতি। অ্যাকশননির্ভর চরিত্রের বাইরে গিয়ে একজন সংবেদনশীল সংগীতশিল্পীর ভূমিকায় নিজেকে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছেন তিনি। বিশেষ করে হতাশা, একাকিত্ব ও মানসিক ভাঙনের দৃশ্যগুলোতে তাঁর অভিনয় দর্শকদের নজর কাড়তে পারে।
সাবিলা নূরও মীরা চরিত্রে স্বাভাবিক ও সাবলীল অভিনয় করেছেন। শাকিবের সঙ্গে তাঁর রোমান্টিক দৃশ্যগুলো গল্পে আবেগের মাত্রা যোগ করেছে। পাশাপাশি তানজিয়া মিথিলা, কাজী সাবির এবং অন্যান্য শিল্পীরাও নিজেদের চরিত্র অনুযায়ী গ্রহণযোগ্য অভিনয় উপহার দিয়েছেন।
চলচ্চিত্রটির দৃশ্যধারণ অন্যতম ইতিবাচক দিক। কনসার্ট, ব্যান্ডের অনুশীলন কিংবা বড় মঞ্চের পরিবেশগুলো বিশ্বাসযোগ্যভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সংগীতশিল্পীর জীবনযাত্রা ও তার চারপাশের জগৎ নির্মাণে নির্মাতার প্রচেষ্টা চোখে পড়ে।
ছবিতে একাধিক গান রয়েছে, যেগুলোর মধ্যে প্রেম, সংগ্রাম, বিচ্ছেদ ও আত্মঅনুসন্ধানের নানা অনুভূতি ফুটে উঠেছে। কয়েকটি গান দর্শকের মনে জায়গা করে নিতে সক্ষম হলেও সব গান সমানভাবে গল্পের সঙ্গে মিশে যেতে পারেনি।
‘রকস্টার’-এর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো মূল চরিত্রের উত্থানকে পর্যাপ্তভাবে ব্যাখ্যা করতে না পারা। আগুন কীভাবে এত দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, তার যাত্রাপথ আরও বিস্তারিতভাবে দেখানো গেলে গল্পটি শক্তিশালী হতো।
এ ছাড়া কিছু দৃশ্য অপ্রয়োজনীয়ভাবে দীর্ঘ মনে হতে পারে। কয়েকটি পার্শ্বচরিত্রের উপস্থিতিও যথেষ্ট ব্যাখ্যা পায়নি। ফলে কিছু জায়গায় গল্পের ধারাবাহিকতা খানিকটা দুর্বল হয়ে পড়ে।
সব মিলিয়ে ‘রকস্টার’ নিখুঁত সিনেমা না হলেও এটি শাকিব খানের ক্যারিয়ারে একটি ব্যতিক্রমী সংযোজন। একজন গায়ক ও আবেগপ্রবণ চরিত্রে তাঁকে নতুনভাবে দেখার সুযোগ দিয়েছে ছবিটি। প্রথম চলচ্চিত্রেই প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে ভিন্ন গল্প বলার চেষ্টা করেছেন পরিচালক আজমান রুশো, আর সেই সাহসিকতার জন্য ছবিটি আলাদা করে প্রশংসা পাওয়ার দাবিদার।