
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের উত্তেজনা আরও এক ধাপ বেড়েছে আজভ সাগর ও রুশ-নিয়ন্ত্রিত উপকূলীয় এলাকায়। ইউক্রেনীয় বাহিনী জানিয়েছে, সামরিক ও কৌশলগত লক্ষ্যবস্তু হিসেবে চিহ্নিত পাঁচটি পণ্যবাহী জাহাজে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে আজারবাইজানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
‘অবৈধ কার্গো বহন করছিল জাহাজগুলো’
ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর দাবি, হামলাকৃত জাহাজগুলো অবৈধভাবে সামরিক সরঞ্জাম, জ্বালানি এবং দখলকৃত অঞ্চল থেকে লুট করা শস্য পরিবহনে ব্যবহৃত হচ্ছিল।
ইউক্রেনীয় নৌ-ড্রোন বাহিনীর কমান্ডার রবার্ট ব্রভদি বলেন, মারিউপোল ও বেরদিয়ানস্ক বন্দরের কাছে রুশ অধিকৃত এলাকায় অবস্থানরত পাঁচটি জাহাজকে লক্ষ্য করে এই অভিযান চালানো হয়। তাঁর ভাষ্য, জাহাজগুলোকে ইচ্ছাকৃতভাবে রাডার থেকে আড়াল করা হয়েছিল এবং পরিচয় গোপন রাখতে নাম পরিবর্তন করা হয়েছিল।
নিহত পাঁচজনের তথ্য নিশ্চিত করল আজারবাইজান
আজারবাইজানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হামলায় দুটি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এতে পাঁচজন আজারবাইজানি নাগরিক নিহত হয়েছেন। তবে মন্ত্রণালয় স্পষ্টভাবে বলেনি, এই হামলার জন্য কোনো দেশকে দায়ী করা হচ্ছে কি না।
মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্ত জাহাজ দুটি ছিল “নাস্ত্রা” ও “সারকন”।
যুদ্ধের মধ্যে কৌশলগত সমুদ্রপথ
আজভ সাগর ও কৃষ্ণ সাগর সংলগ্ন অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক যুদ্ধক্ষেত্র। ইউক্রেনের দাবি, এই অঞ্চল দিয়ে রাশিয়া অধিকৃত এলাকাগুলো থেকে শস্য ও জ্বালানি পাচার করা হচ্ছে।
ইউক্রেনীয় পক্ষের মতে, এসব জাহাজ শুধু বাণিজ্যিক নয়, বরং সামরিক লজিস্টিক সাপোর্টেও ব্যবহৃত হচ্ছিল।
পুতিনের বক্তব্যের আগেই হামলা
এই হামলা এমন সময় চালানো হয়, যখন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সেন্ট পিটার্সবার্গে একটি বড় অর্থনৈতিক ফোরামে বক্তব্য দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এর এক দিন আগেই ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়ে সরাসরি আলোচনার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
বিশ্লেষকদের মতে, সময় নির্বাচনের দিক থেকে এই হামলা রাজনৈতিক ও সামরিক উভয় বার্তা বহন করছে।
ইউক্রেনের সমুদ্র অভিযান ও পাল্টা হামলা
ইউক্রেনের দাবি, তারা রাশিয়ার সামরিক ও জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে ধারাবাহিকভাবে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, যাতে মস্কোর যুদ্ধ সক্ষমতা দুর্বল করা যায়।
এর আগে পুতিন সেন্ট পিটার্সবার্গে পৌঁছানোর আগেই শহরের উপকণ্ঠে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছিল বলেও কিয়েভ জানিয়েছে।
রোমানিয়া উপকূলে নৌ-ড্রোন বিস্ফোরণ
এদিকে ইউক্রেন নিশ্চিত করেছে, শুক্রবার রোমানিয়া উপকূলের কাছে তাদের একটি নৌ-ড্রোন বিস্ফোরিত হয়েছে। তবে এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি বলে জানানো হয়েছে।
এই ঘটনার ফলে কৃষ্ণ সাগর অঞ্চলে নৌ-নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
শান্তি আলোচনা ও যুদ্ধের বাস্তবতা
যদিও জেলেনস্কি শান্তি আলোচনার আহ্বান জানাচ্ছেন এবং যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিচ্ছেন, বাস্তবে দুই পক্ষই একে অপরের ওপর হামলা অব্যাহত রেখেছে। ফলে শান্তি প্রক্রিয়া কার্যত অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের হামলা যুদ্ধকে আরও দীর্ঘায়িত ও জটিল করে তুলছে, বিশেষ করে যখন সমুদ্রপথ এখন উভয় পক্ষের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।
আজভ সাগরে সাম্প্রতিক ড্রোন হামলা আবারও প্রমাণ করেছে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এখন কেবল স্থলযুদ্ধে সীমাবদ্ধ নয়—বরং আকাশ ও সমুদ্রপথে ছড়িয়ে পড়া এক বহুমাত্রিক সংঘাতে রূপ নিয়েছে। নিহতদের সংখ্যা ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সামনে এলে এই সংঘাতের মানবিক ও কৌশলগত প্রভাব আরও স্পষ্ট হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।