
বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তি হলেও জাপান এখন এক অভূতপূর্ব জনসংখ্যাগত সংকটের মুখে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে নিম্ন জন্মহার ও দ্রুত বৃদ্ধ জনসংখ্যার চাপের ফলে দেশটির জনসংখ্যা ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পাচ্ছে, যা অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে।
সরকারি সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে জাপানে শিশু জন্মহার নেমে এসেছে ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে। একই সঙ্গে গত পাঁচ বছরে দেশটির জনসংখ্যা কমেছে প্রায় ৩১ লাখ, যা আধুনিক জাপানের ইতিহাসে সবচেয়ে দ্রুত পতন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
জনসংখ্যা কমছে দ্রুতগতিতে
২৯ মে প্রকাশিত ২০২৫ সালের আদমশুমারির প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী, জাপানের মোট জনসংখ্যা এখন ১২ কোটি ৩০ লাখ ৪৯ হাজার ৫২৪ জন। ২০২০ সালের তুলনায় এটি প্রায় ২.৫ শতাংশ কম।
এই হ্রাসের ফলে বিশ্বের জনবহুল দেশের তালিকায় জাপান এক ধাপ পিছিয়ে ১২তম অবস্থানে নেমে এসেছে।
তবে একই সময়ে একটি ব্যতিক্রমী প্রবণতা দেখা গেছে—বিদেশি বাসিন্দার সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৩২ লাখ ১০ হাজারে পৌঁছেছে, যা দেশটির শ্রমবাজারে অভিবাসনের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা নির্দেশ করে।
দেশটির ৪৭টি প্রশাসনিক অঞ্চলের মধ্যে শুধু টোকিও ও ওকিনাওয়ায় জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, বাকি ৪৫টি অঞ্চলে জনসংখ্যা কমেছে।
জন্মহার নেমে এসেছে রেকর্ড নিচে
জাপানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে জন্ম নেওয়া শিশুর সংখ্যা ছিল ৬ লাখ ৭১ হাজার ২৩৬ জন—যা ১৮৯৯ সালে রেকর্ড সংরক্ষণ শুরু হওয়ার পর সর্বনিম্ন।
একই সময়ে প্রজনন হার (Fertility Rate) নেমে এসেছে ১.১৪-এ। জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখতে এই হার অন্তত ২.১ হওয়া প্রয়োজন।
মৃত্যুর সংখ্যা দীর্ঘদিন ধরেই জন্মের তুলনায় বেশি হওয়ায় জনসংখ্যা সংকোচন আরও তীব্র হচ্ছে।
তরুণ প্রজন্মের অনাগ্রহ ও অর্থনৈতিক চাপ
বিশেষজ্ঞদের মতে, জাপানের এই জনসংখ্যাগত সংকটের পেছনে একাধিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ রয়েছে।
প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে—
উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়
অনিশ্চিত ও অনিয়মিত চাকরি বাজার
উচ্চ শিক্ষা ও আবাসন ব্যয়
দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও কর্মসংস্কৃতি
লিঙ্গভিত্তিক কর্মক্ষেত্র বৈষম্য
এই সব কারণ তরুণদের মধ্যে বিয়ে ও সন্তান নেওয়ার প্রবণতা কমিয়ে দিয়েছে।
বিশেষ করে শহরাঞ্চলে বাসস্থান ব্যয়ের চাপ ও কর্মজীবনের অনিশ্চয়তা পরিবার গঠনের সিদ্ধান্তকে আরও জটিল করে তুলছে।
প্রবীণ সমাজে দ্রুত রূপান্তর
জন্মহার কমার সঙ্গে সঙ্গে জাপান দ্রুত একটি ‘সুপার-এজড সোসাইটি’ বা প্রবীণ সমাজে পরিণত হচ্ছে।
বর্তমানে দেশের প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ প্রবীণ বয়সের। অনুমান করা হচ্ছে, ২০৭০ সালের মধ্যে এই হার ৪০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
গড় আয়ু বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৫ বছরে, আর শতবর্ষী মানুষের সংখ্যা ইতোমধ্যে প্রায় ১ লাখে পৌঁছেছে।
অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি চাপ
জনসংখ্যা কমার ফলে জাপানের শ্রমবাজার ও অর্থনীতি একাধিক চাপের মুখে পড়েছে।
কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী দ্রুত কমছে
পেনশন ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় বাড়ছে
গ্রামীণ অঞ্চলে জনশূন্যতা বাড়ছে
উৎপাদনশীলতা ধরে রাখা কঠিন হচ্ছে
তরুণরা টোকিওসহ বড় শহরে চলে যাওয়ায় আঞ্চলিক অর্থনীতি আরও দুর্বল হয়ে পড়ছে।
সরকারের প্রতিক্রিয়া ও নীতিগত উদ্যোগ
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এই পরিস্থিতিকে “নীরব জরুরি অবস্থা” হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
সরকারের পক্ষ থেকে নেওয়া কিছু উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে—
শিশু ভাতা বৃদ্ধি
মাতৃত্ব ও পিতৃত্বকালীন ছুটি সম্প্রসারণ
তরুণদের আয় বৃদ্ধির নীতি
কর্মক্ষেত্রে পরিবারবান্ধব সংস্কার
এ ছাড়া শ্রম ঘাটতি মোকাবিলায়—
অটোমেশন ও রোবটিক্সের ব্যবহার বৃদ্ধি
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি প্রয়োগ
৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের কর্মক্ষেত্রে ধরে রাখা
বিদেশি শ্রমিক নিয়োগ বৃদ্ধি
কাঙ্ক্ষিত ফল না আসায় প্রশ্ন
সরকারের নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও জন্মহার বাড়াতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য না আসায় নীতিগত কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জাপানের সংকট কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং গভীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের ফল।
এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী দশকে জাপানের অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামো আরও কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জাপানের জনসংখ্যা সংকট এখন শুধু একটি জাতীয় ইস্যু নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি ও উন্নয়ন মডেলের জন্যও একটি সতর্কবার্তা। প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও অর্থনৈতিক শক্তি থাকা সত্ত্বেও জনসংখ্যাগত ভারসাম্য হারালে দীর্ঘমেয়াদে যে কোনো উন্নত দেশই গভীর কাঠামোগত চাপে পড়তে পারে—জাপান তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হয়ে উঠছে।