
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে নতুন রাজনৈতিক-সামাজিক আন্দোলনের সূচনা করেছে ‘ককরোচ জাতীয় পার্টি’ (সিজেপি)। শিক্ষাব্যবস্থায় অনিয়ম, প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং প্রশাসনিক দুর্নীতির অভিযোগ তুলে দেশটির শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করেছে সংগঠনটি। দাবি পূরণ না হলে দেশজুড়ে আন্দোলন ছড়িয়ে দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে তারা।
শনিবার দুপুরে যন্তর মন্তরে আয়োজিত প্রথম বিক্ষোভ সমাবেশে অংশ নেন লাদাখের খ্যাতনামা পরিবেশ আন্দোলনকর্মী ও ম্যাগসাইসাই পুরস্কারজয়ী শিক্ষাবিদ Sonam Wangchuk। সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে আসা আন্দোলন সংগঠক অভিজিৎ দীপকসহ একাধিক তরুণ ও সামাজিক আন্দোলনকর্মী।
যন্তর মন্তরের সমাবেশ ও আন্দোলনের ঘোষণা
সমাবেশে ঘোষণা দেওয়া হয়, শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ না করলে আগামী দিনগুলোতে ‘তেলাপোকা’ প্রতীকে দেশব্যাপী বিক্ষোভ কর্মসূচি চালানো হবে। আন্দোলনের নেতৃত্ব জানায়, আগামী ১৩ জুন আবার যন্তর মন্তরে বড় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে।
আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বিকেল পাঁচটার মধ্যে পদত্যাগ না এলে সারা দেশের শিক্ষার্থী ও যুবসমাজকে নিয়ে ধারাবাহিক আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।
সমাবেশে অংশ নেওয়া বিভিন্ন বক্তা অভিযোগ করেন, জাতীয় পরীক্ষা ব্যবস্থা, বিশেষ করে NEET ও CBSE পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতা দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে গভীর সংকট তৈরি করেছে।
সোনম ওয়াংচুকের অবস্থান
সমাবেশে অংশ নিয়ে সোনম ওয়াংচুক বলেন, এই কর্মসূচি কোনো সহিংস আন্দোলন নয়, বরং সরকারের কাছে একটি “আবেদন”।
তিনি বলেন,
“এটি বিক্ষোভের চেয়ে বেশি একটি গণতান্ত্রিক আহ্বান। আমরা চাই, সরকার শিক্ষাক্ষেত্রে অনিয়ম ও দুর্নীতির দায় স্বীকার করুক।”
তিনি আরও বলেন, আন্দোলনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে—এটি ইতিবাচক দিক এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে মতপ্রকাশের সুযোগ থাকা উচিত।
ওয়াংচুক সম্প্রতি ছয় মাসের আটক পর্ব শেষে মুক্তি পান, যেখানে তার বিরুদ্ধে ‘দেশবিরোধী কার্যকলাপ’-এর অভিযোগ আনা হয়েছিল এবং পরে আদালতের নির্দেশে মুক্তি দেওয়া হয়।
আন্দোলনের নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক সমর্থন
আন্দোলনের আরেক সংগঠক অভিজিৎ দীপক বলেন, সরকার পদত্যাগ না করলে সারা দেশে ধারাবাহিক বিক্ষোভ শুরু হবে। তিনি জানান, সপ্তাহজুড়ে বিভিন্ন রাজ্যে যুবসমাজকে সংগঠিত করা হবে এবং ১৩ জুন আবারও দিল্লিতে বড় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে।
সমাবেশে মহারাষ্ট্রের এনসিপি (শরদ পাওয়ার অংশ) নেতা Rohit Pawar আন্দোলনের দাবির প্রতি সমর্থন জানান। তিনি বলেন, শিক্ষাক্ষেত্রে অনিয়ম নিয়ে তরুণদের ক্ষোভ সরকারের ব্যর্থতার প্রতিফলন।
গ্রেপ্তার আশঙ্কা ও রাজনৈতিক উত্তেজনা
অভিজিৎ দীপক সমাবেশে বলেন, দেশে ফেরার আগে তিনি গ্রেপ্তার হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। তার ভাষায়, “মা ও পরিবারের সদস্যরাও আশঙ্কা করেছিলেন, ফেরার পর তাকে কারাগারে যেতে হতে পারে।”
তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ভয়ের সংস্কৃতি থেকে তরুণদের বেরিয়ে আসতে হবে এবং প্রশ্ন তোলার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
‘তেলাপোকা’ মন্তব্য ঘিরে বিতর্কের পটভূমি
এই আন্দোলনের নাম ও প্রতীক নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির এক মন্তব্যকে কেন্দ্র করে। সম্প্রতি এক শুনানিতে তিনি তরুণদের একটি অংশকে “পরজীবী ও তেলাপোকা” হিসেবে উল্লেখ করেন বলে অভিযোগ ওঠে।
এই মন্তব্যের পরই তরুণদের একাংশের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় ‘ককরোচ জাতীয় পার্টি’ নামক প্রতীকী আন্দোলনের সূচনা হয়, যা এখন শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার ও প্রশাসনিক জবাবদিহির দাবিতে রূপ নিয়েছে।
বিশ্লেষণ: প্রতীকী রাজনীতি থেকে বাস্তব আন্দোলনের দিকে
বিশ্লেষকদের মতে, সিজেপির এই আন্দোলন মূলত প্রতীকী প্রতিবাদ থেকে শুরু হলেও দ্রুত তা সংগঠিত রাজনৈতিক চাপের রূপ নিচ্ছে। বিশেষ করে শিক্ষাব্যবস্থার অনিয়ম, পরীক্ষার নিরাপত্তা সংকট এবং যুব বেকারত্বের প্রশ্ন আন্দোলনকে বিস্তৃত সামাজিক সমর্থন দিতে পারে।
তবে আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে সরকারের প্রতিক্রিয়া, প্রশাসনিক পদক্ষেপ এবং আন্দোলনের ধারাবাহিক সংগঠনের সক্ষমতার ওপর।
যন্তর মন্তরের এই বিক্ষোভ ভারতের তরুণ প্রজন্মের হতাশা ও ক্ষোভের একটি নতুন বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারের দাবি থেকে শুরু হলেও এটি এখন রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির একটি বৃহত্তর আন্দোলনে পরিণত হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।