প্রিন্ট এর তারিখঃ Jun 7, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ Jun 7, 2026 ইং
শিশু সুরক্ষায় জাতীয় সংকট: বাড়ছে উদ্বেগ

বাংলাদেশে শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা, নির্যাতন ও মানসিক নিপীড়নের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। গতকাল শনিবার রাজধানীর শাহবাগে আবু সাঈদ কনভেনশন সেন্টারে আয়োজিত ‘বাংলাদেশে শিশু নির্যাতন বৃদ্ধি ও করণীয়’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে শিশু সুরক্ষা বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতিকে একটি ‘জাতীয় সংকট’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। বৈঠকে বিভিন্ন জরিপ ও গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করে বক্তারা জানান, দেশে শিশুদের সুরক্ষায় আইনি কাঠামো থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগ ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে।
শিশু নির্যাতনের বর্তমান চিত্র, আইনি জটিলতা এবং নীতি-নির্ধারকদের প্রস্তাবনাসমূহ নিচে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো:
বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও মামলার পরিসংখ্যান
গোলটেবিল বৈঠকে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের তথ্য উদ্ধৃত করে জানানো হয়, দেশে প্রতি ১০ জন শিশুর মধ্যে প্রায় ৯ জনই কোনো না কোনোভাবে সহিংস আচরণের মুখোমুখি হচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, শিশুদের ওপর সংঘটিত বিভিন্ন সহিংসতার ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলাগুলোর মধ্যে দণ্ডাদেশের হার মাত্র ২ শতাংশ। অর্থাৎ, আইনি জটিলতা বা অন্যান্য কারণে ৯৮ শতাংশ মামলার অভিযুক্তরাই শেষ পর্যন্ত শাস্তি পাচ্ছে না। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে শিশু নির্যাতনের বেশ কিছু ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে এবং ইউনিসেফের তথ্যমতে, বিগত এক দশকে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর মধ্যে চূড়ান্ত বিচার সম্পন্ন হওয়ার হার অত্যন্ত সীমিত।
আইনি সংস্কার ও জাতীয় টাস্কফোর্সের প্রস্তাব
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার বলেন, “শিশু সুরক্ষা কেবল সামাজিক দায়িত্ব নয়, এটি রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব।” এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় তিনি দ্রুত একটি জাতীয় টাস্কফোর্স এবং ‘ন্যাশনাল কমিশন ফর চাইল্ড প্রোটেকশন’ গঠনের প্রস্তাব দেন। এছাড়া অপরাধীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডার বা ‘চাইল্ড অফেন্ডার রেজিস্ট্রি’ তৈরির ওপর জোর দেন তিনি। সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার ফারজানা শারমীন তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, কেবল আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়, প্রযুক্তির অপব্যবহার ও অনলাইন অপরাধের হাত থেকে শিশুদের বাঁচাতে পরিবার ও রাষ্ট্রকে সম্মিলিত ভূমিকা পালন করতে হবে।
সুরক্ষায় ১০ দফা সুপারিশ
বৈঠকের শেষভাগে দেশের প্রখ্যাত চিকিৎসক, সমাজবিজ্ঞানী ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের উপস্থিতিতে শিশু সুরক্ষায় ১০টি সুনির্দিষ্ট সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালা: প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক শিশু সুরক্ষা নীতিমালা কার্যকর করা।
ডেস্ক স্থাপন: জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিশেষায়িত ‘চাইল্ড প্রোটেকশন ডেস্ক’ চালু করা।
হেল্পলাইনের আধুনিকায়ন: জাতীয় শিশু হেল্পলাইন ‘১০৯৮’-এর কারিগরি ও প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।
সচেতনতা বৃদ্ধি: স্বাস্থ্যকর্মী ও শিক্ষকদের বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রদান এবং গণমাধ্যমে সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা।
বক্তারা সম্মিলিতভাবে একমত পোষণ করেন যে, আইনি প্রক্রিয়ার গতি ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনই পারে শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে।
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ বার্তা এক্সপ্রেস