
জার্মানিতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণে আগ্রহী আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য স্টুডেন্ট ভিসা একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। দেশটির কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি নিশ্চিত হওয়ার পরই শিক্ষার্থীদের জার্মান স্টুডেন্ট ভিসার জন্য আবেদন করতে হয়। জার্মান ভিসাসংক্রান্ত তথ্যভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম ‘জার্মানি ভিসা’র নির্দেশনা অনুযায়ী, জার্মানিতে পড়াশোনা শুরু করার আগে অধিকাংশ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর জন্য এই ভিসা বাধ্যতামূলক।
দীর্ঘমেয়াদি ‘ডি’ ভিসা
জার্মান স্টুডেন্ট ভিসা মূলত দীর্ঘমেয়াদি ন্যাশনাল ‘ডি’ (D) ভিসা হিসেবে প্রদান করা হয়। এটি একাধিকবার জার্মানিতে প্রবেশ ও বের হওয়ার সুযোগ দেয় এবং সাধারণত দুই বছরের জন্য বৈধ থাকে। প্রয়োজন অনুযায়ী পরবর্তীতে আরও দুই বছর পর্যন্ত এর মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। বর্তমানে এ ভিসার আবেদন ফি ৭৫ ইউরো, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১০ হাজার ৭২৫ টাকার সমান।
কারা আবেদন করতে পারবেন
স্টুডেন্ট ভিসার জন্য আবেদন করতে হলে প্রথম শর্ত হলো জার্মানির কোনো স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় বা উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি নিশ্চিত করা। পাশাপাশি আবেদনকারীকে প্রমাণ করতে হবে যে তিনি জার্মানিতে অবস্থানকালে নিজের জীবনযাত্রা ও শিক্ষাসংক্রান্ত ব্যয় বহনে সক্ষম।
এ জন্য শিক্ষার্থীদের ব্লকড অ্যাকাউন্টে কমপক্ষে ১১ হাজার ৯০৪ ইউরো (প্রায় ১৭ লাখ ২ হাজার টাকা) জমা থাকার প্রমাণ দেখাতে হবে। বিকল্প হিসেবে বৈধ স্কলারশিপ বা বৃত্তির নথিও গ্রহণযোগ্য। সংশ্লিষ্ট কোর্সের ক্ষেত্রে প্রয়োজন হলে জার্মান বা ইংরেজি ভাষায় দক্ষতার প্রমাণপত্রও জমা দিতে হবে।
যেসব শিক্ষার্থী ভিসা ছাড়া প্রবেশ করতে পারবেন
জার্মানিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে কিছু দেশের নাগরিক বিশেষ সুবিধা পান। অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ইসরায়েল, জাপান, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের জার্মানিতে প্রবেশের আগে আলাদা স্টুডেন্ট ভিসা নিতে হয় না। তারা জার্মানিতে পৌঁছানোর পর স্থানীয় ফরেইনার্স অফিসে আবাসিক অনুমতির জন্য আবেদন করতে পারেন।
তবে ভিসামুক্ত দেশের শিক্ষার্থীদেরও যদি ৯০ দিনের বেশি সময়ের কোনো কোর্সে অংশ নিতে হয়, তাহলে আবাসিক অনুমোদন বা রেসিডেন্স পারমিট গ্রহণ করতে হবে। অন্যদিকে ৯০ দিনের কম সময়ের স্বল্পমেয়াদি শিক্ষাক্রম বা কিছু এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামের ক্ষেত্রে শেনজেন ভিসা প্রযোজ্য হতে পারে।
বিভিন্ন ধরনের স্টাডি ভিসা
জার্মানিতে পড়াশোনার উদ্দেশ্য ও কোর্সের ধরন অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের স্টাডি ভিসা রয়েছে। এর মধ্যে পূর্ণকালীন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা, উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতিমূলক জার্মান ভাষা কোর্স, স্টুডিয়েনকলেগ (Studienkolleg), বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতিমূলক কোর্স এবং বাধ্যতামূলক প্রাক-ইন্টার্নশিপের জন্য পৃথক ভিসা ক্যাটাগরি রয়েছে।
আবেদন করবেন যেভাবে
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি নিশ্চিত হওয়ার পর আবেদনকারীকে নিজ দেশের জার্মান দূতাবাস বা কনস্যুলেটের মাধ্যমে স্টুডেন্ট ভিসার আবেদন করতে হবে। বর্তমানে অনেক দেশে অনলাইন আবেদন সুবিধা চালু রয়েছে। বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরাও অনলাইনের মাধ্যমে ভিসা আবেদন প্রক্রিয়া শুরু করতে পারেন।
আবেদন জমা দেওয়ার পর সাধারণত সাক্ষাৎকার, বায়োমেট্রিক তথ্য প্রদান এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র যাচাইয়ের ধাপ সম্পন্ন করতে হয়। ভিসা প্রক্রিয়া শেষ হতে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি নিশ্চিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আবেদন প্রক্রিয়া শুরু করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
যেসব কাগজপত্র প্রয়োজন
স্টুডেন্ট ভিসার আবেদনের সঙ্গে পূরণকৃত আবেদনপত্র, বৈধ পাসপোর্ট, নির্ধারিত আকারের পাসপোর্ট সাইজ ছবি এবং বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির প্রমাণপত্র জমা দিতে হবে।
এ ছাড়া একাডেমিক সনদ ও ট্রান্সক্রিপ্ট, ভাষাগত দক্ষতার সনদ, প্রাথমিক সময়ের ভ্রমণ স্বাস্থ্যবিমা, জীবনবৃত্তান্ত (সিভি) এবং মোটিভেশন লেটারও প্রয়োজন হবে।
আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ হিসেবে আবেদনকারী স্কলারশিপের নথি, জার্মানিতে অবস্থানরত কোনো ব্যক্তির স্পনসরশিপ ঘোষণা, ন্যূনতম ১১ হাজার ৯০৪ ইউরো জমা থাকা ব্লকড অ্যাকাউন্টের তথ্য অথবা অভিভাবকের আর্থিক ঘোষণাপত্র জমা দিতে পারবেন।
আগেভাগে প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ
বিশেষজ্ঞদের মতে, জার্মান স্টুডেন্ট ভিসা প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সময়মতো আবেদন এবং সঠিক নথিপত্র প্রস্তুত রাখা। ব্লকড অ্যাকাউন্ট খোলা, ভাষাগত দক্ষতার সনদ সংগ্রহ, মোটিভেশন লেটার প্রস্তুত এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অফার লেটার হাতে পাওয়ার পর দ্রুত আবেদন করলে ভিসা পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় উচ্চশিক্ষার গন্তব্য জার্মানিতে প্রতিবছর হাজারো আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী পড়াশোনার সুযোগ পান। তুলনামূলক কম শিক্ষাব্যয়, উন্নত গবেষণা সুবিধা এবং আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা ব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের কাছেও দেশটির জনপ্রিয়তা ক্রমেই বাড়ছে।