
বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ পরীক্ষায় গাইড বই বা নোটবই থেকে প্রশ্ন সংগ্রহ করে পরীক্ষা নেওয়ার প্রবণতা রোধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) ময়মনসিংহ অঞ্চল। এখন থেকে ঢাকাময়মনসিংহ অঞ্চলের সব সরকারি ও বেসরকারি মাধ্যমিক ও নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের নিজস্বভাবে প্রণীত প্রশ্নপত্রের মাধ্যমেই অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা গ্রহণ করতে হবে। অন্য কোনো উৎস থেকে সংগৃহীত প্রশ্নপত্র ব্যবহার করে পরীক্ষা নেওয়া যাবে না।
সম্প্রতি ৩ জুন ২০২৬ তারিখে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের ময়মনসিংহ অঞ্চলের উপপরিচালক মোহা. নাসির উদ্দিন স্বাক্ষরিত এক নোটিশে এ নির্দেশনা জারি করা হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার আলোকে জারি করা এ নোটিশে বিদ্যালয়গুলোর পরীক্ষাব্যবস্থাকে আরও কার্যকর, স্বচ্ছ ও শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
গাইড ও নোটবই থেকে প্রশ্ন নেওয়ার অভিযোগ
অধিদপ্তরের নোটিশে বলা হয়েছে, সম্প্রতি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গাইড বই, নোটবই কিংবা অন্যান্য বাহ্যিক উৎস থেকে প্রশ্ন সংগ্রহ করে পরীক্ষা নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব অভিযোগ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, কিছু প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের নিজস্ব প্রশ্ন প্রণয়নের পরিবর্তে প্রস্তুত প্রশ্নপত্রের ওপর নির্ভরশীলতা তৈরি হয়েছে।
শিক্ষা প্রশাসনের মতে, এ ধরনের চর্চা শিক্ষার্থীদের প্রকৃত জ্ঞান ও দক্ষতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। একই সঙ্গে এটি পাঠ্যপুস্তকভিত্তিক শিক্ষার পরিবর্তে গাইডনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করে, যা জাতীয় শিক্ষানীতির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
শিক্ষকরাই তৈরি করবেন প্রশ্নপত্র
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী বিদ্যালয়ের অর্ধবার্ষিক, বার্ষিক, প্রাক্-নির্বাচনী ও নির্বাচনীসহ সব ধরনের অভ্যন্তরীণ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদেরই প্রণয়ন করতে হবে।
নোটিশে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, কোনো অবস্থাতেই বাইরের কোনো উৎস, গাইড বই, নোটবই কিংবা বাণিজ্যিকভাবে প্রস্তুত করা প্রশ্নপত্র ব্যবহার করে পরীক্ষা গ্রহণ করা যাবে না।
এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের শিক্ষকরা পাঠ্যসূচি, পাঠ্যপুস্তক এবং শিক্ষার্থীদের অর্জিত শিখনফলের ভিত্তিতে প্রশ্নপত্র তৈরি করবেন। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শিক্ষাগত অগ্রগতি মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে বলে মনে করছে শিক্ষা প্রশাসন।
শিক্ষার্থীদের প্রকৃত মেধা যাচাইয়ের ওপর গুরুত্ব
অধিদপ্তরের মতে, পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীদের শেখার অগ্রগতি, বিশ্লেষণী ক্ষমতা ও অর্জিত জ্ঞান মূল্যায়ন করা। কিন্তু গাইড বই বা নোটবইভিত্তিক প্রশ্নপত্র ব্যবহার করলে সেই উদ্দেশ্য অনেকাংশে ব্যাহত হয়।
এ কারণে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত মেধা ও দক্ষতা যাচাইয়ের স্বার্থে শিক্ষক-প্রণীত প্রশ্নপত্রের মাধ্যমে পরীক্ষা গ্রহণ নিশ্চিত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পাঠ্যবইভিত্তিক শিক্ষা ও শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের মান উন্নয়নের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে নতুন এই সিদ্ধান্তে।
প্রতিষ্ঠান প্রধানদের কঠোর নির্দেশনা
নোটিশে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানকে নির্দেশনাটি কঠোরভাবে অনুসরণ করার জন্য বলা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের দায়িত্ব হবে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও ব্যবহার সংক্রান্ত পুরো প্রক্রিয়া তদারকি করা এবং কোনো ধরনের অনিয়ম যাতে না ঘটে তা নিশ্চিত করা।
পাশাপাশি ময়মনসিংহ অঞ্চলের জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তাদেরও বিষয়টি পর্যবেক্ষণ ও বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
শিক্ষা প্রশাসন আশা করছে, মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সক্রিয় তদারকির মাধ্যমে নির্দেশনাটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।
শিক্ষার মানোন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাবের আশা
শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, এই নির্দেশনা বাস্তবায়িত হলে বিদ্যালয় পর্যায়ে প্রশ্নপত্র প্রণয়নে শিক্ষকদের দায়িত্বশীলতা ও পেশাগত দক্ষতা আরও বৃদ্ধি পাবে।
তাঁদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গাইড ও নোটবইনির্ভর প্রশ্নপত্র ব্যবহারের কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মুখস্থনির্ভর শিক্ষার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। নতুন নির্দেশনার ফলে পাঠ্যপুস্তকভিত্তিক অধ্যয়ন, ধারণাভিত্তিক শিক্ষা এবং সৃজনশীল চিন্তাশক্তির বিকাশে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, শিক্ষকরা যখন নিজেরা প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করবেন, তখন শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ও মূল্যায়নের মধ্যে একটি কার্যকর সংযোগ তৈরি হবে। এতে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শেখা মূল্যায়ন করা সহজ হবে এবং শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত মান উন্নয়নের পথ আরও সুগম হবে।
গাইডনির্ভরতা কমিয়ে পাঠ্যবইকেন্দ্রিক শিক্ষার দিকে জোর
শিক্ষাবিদদের মতে, বিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবই ও মূল শিক্ষাসামগ্রীর প্রতি আগ্রহ বাড়াতে হলে পরীক্ষাব্যবস্থাকে অবশ্যই পাঠ্যবইভিত্তিক হতে হবে। গাইড বইনির্ভর প্রশ্নপত্রের কারণে অনেক শিক্ষার্থী মূল পাঠ্যবই পড়ার পরিবর্তে সংক্ষিপ্ত নোট বা সাজেশনভিত্তিক প্রস্তুতির দিকে ঝুঁকে পড়ে।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের এই নতুন নির্দেশনা বাস্তবায়িত হলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পাঠ্যবই অধ্যয়নের প্রবণতা বৃদ্ধি পাবে, সৃজনশীল ও বিশ্লেষণধর্মী চিন্তার বিকাশ ঘটবে এবং সামগ্রিকভাবে বিদ্যালয় শিক্ষার মান উন্নয়নে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা।